
শিক্ষার্থীদের সরাসরি শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে শেখার সুযোগ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির সরকারি স্কুলগুলোতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত জেনারেটিভ এআই ব্যবহারে এক বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে কার্যকর হতে যাওয়া এই সিদ্ধান্তের আওতায় পড়বে প্রায় ৬ লাখ শিক্ষার্থী।
২ সেপ্টেম্বর ব্রুকলিন নেভি ইয়ার্ডের ব্রুকলিন স্টিম সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি ও স্কুল চ্যান্সেলর কামার স্যামুয়েলস। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন শিক্ষাবর্ষে এ নীতি কার্যকর হবে।
নতুন নীতিতে ২-কে থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য তৈরি সব ধরনের জেনারেটিভ এআই সফটওয়্যার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি সব শ্রেণির শিক্ষার্থীর জন্য এআইভিত্তিক ‘কম্প্যানিয়ন চ্যাটবট’ ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এক বছর ধরে স্কুলে এআই ব্যবহারের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হবে। এরপর পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের জন্য এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতি নির্ধারণ করা হবে।
তবে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এআই পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়নি। সর্বোচ্চ ৫০ হাজার শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করে পাঁচটি এআই পাইলট কর্মসূচি চালু করা হবে। প্রতিটি উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে সর্বোচ্চ পাঁচটি শ্রেণিতে এসব কর্মসূচি পরিচালনা করা যাবে। পুরো কার্যক্রম প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।
পাইলট কর্মসূচিতে কুইল, এডিয়া, ব্রিস্ক টিচিং, প্লেল্যাব এবং ইন্টেল ওল-রেডি স্কুলস—এই পাঁচটি এআই টুল ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট শ্রেণি, নির্ধারিত সময় এবং শিক্ষকের তত্ত্বাবধান ছাড়া শিক্ষার্থীরা এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে না।
উদাহরণ হিসেবে, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য ক্লাসে কুইল সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট এবং গণিত ক্লাসে এডিয়া সর্বোচ্চ ২০ মিনিট ব্যবহার করা যাবে।
এ ছাড়া উচ্চমাধ্যমিকের সব শিক্ষার্থীর জন্য বছরে দুবার ৪৫ মিনিট করে এআই-সাক্ষরতা ক্লাস নেওয়া হবে। এসব ক্লাসে এআইয়ের কার্যপ্রণালি, তৈরি করা তথ্যের নির্ভুলতা যাচাই, অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি, নৈতিক ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রে এআইয়ের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়া হবে।
তবে নতুন নীতিতে কিছু ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শেখার সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে এবং বহুভাষী শিক্ষার্থীদের ভাষাগত সহায়তার প্রয়োজন হলে অনুমোদিত এআই টুল ব্যবহার করা যাবে। কম্পিউটার সায়েন্স ও অন্যান্য ক্যারিয়ার প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচিতেও শিক্ষার প্রয়োজনে নির্দিষ্ট এআই টুল ব্যবহারের অনুমতি থাকবে।
শিক্ষক ও স্কুলকর্মীরাও পাঠ পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক কাজসহ পেশাগত প্রয়োজনে এআই ব্যবহার করতে পারবেন। তবে সংশ্লিষ্ট টুলকে নিউইয়র্ক সিটি পাবলিক স্কুলসের নির্ধারিত গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।
এআই নীতির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত শিক্ষামূলক ডিভাইস বা ‘১:১ ডিভাইস’ ব্যবহারের সময় প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির ক্ষেত্রে এই সময়সীমা ৪৫ মিনিট।
তবে এই সময়সীমা শিক্ষার্থীদের সব ধরনের ডিভাইস ব্যবহারের মোট সময় নয়। ব্যক্তিগত ডিভাইসনির্ভর শিক্ষামূলক কার্যক্রমের সময় কমানোই মূল লক্ষ্য।
মেয়র মামদানি বলেন, ‘শিশুদের শেখা ও বেড়ে ওঠার জন্য শিক্ষক এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ প্রয়োজন।’
তিনি মনে করেন, সহপাঠীদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে দক্ষতা অর্জন, শিক্ষকদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি এবং কঠিন সমস্যা নিজেরা সমাধানের সক্ষমতা গড়ে তোলার সুযোগ শিক্ষার্থীদের দিতে হবে।
এআই প্রসঙ্গে মামদানি আরও বলেন, ‘প্রযুক্তি খাত আমাদের বোঝাতে চায়, এআইনির্ভর প্রাথমিক শিক্ষা শুধু অনিবার্য নয়, বরং প্রয়োজনীয়ও। আমরা বিষয়টি সেভাবে দেখি না।’
এই অবস্থান থেকেই ২-কে থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জেনারেটিভ এআই ব্যবহারে এক বছরের স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
মামদানি ও চ্যান্সেলর স্যামুয়েলসের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এক বছর শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি জোট নতুন নীতির প্রভাব পর্যালোচনা করবে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে নিউইয়র্কের সরকারি স্কুলগুলোতে এআই ব্যবহারের বিষয়ে সুপারিশ করা হবে।