
বিশ্বের শক্তিশালী পাসপোর্টের বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে আবারও পিছিয়েছে বাংলাদেশ। হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্সের ২০২৬ সালের জুলাই সংস্করণে বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ৯৭তম, যা চলতি বছরের জানুয়ারিতে ছিল ৯৫তম। একই অবস্থানে রয়েছে উত্তর কোরিয়াও।
লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স ২১ জুলাই তাদের ওয়েবসাইটে সর্বশেষ পাসপোর্ট সূচক প্রকাশ করে। বিশ্বের ১৯৯টি দেশের পাসপোর্ট এবং ২২৭টি সম্ভাব্য ভ্রমণ গন্তব্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সূচক প্রস্তুত করা হয়েছে। কোনো দেশের নাগরিকরা আগাম ভিসা ছাড়াই বা ভিসা অন অ্যারাইভাল সুবিধায় কতটি দেশে প্রবেশ করতে পারেন, তার ভিত্তিতেই এই র্যাঙ্কিং নির্ধারণ করা হয়।
সর্বশেষ সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা বর্তমানে বিশ্বের ৩৫টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়াই অথবা ভিসা অন অ্যারাইভাল সুবিধায় ভ্রমণ করতে পারেন। অথচ ২০২৬ সালের জানুয়ারি এবং ২০২৫ সালের সূচকে এই সংখ্যা ছিল ৩৭। অর্থাৎ, মাত্র ছয় মাসে বাংলাদেশ দুটি ভিসামুক্ত বা সহজ ভিসা সুবিধার গন্তব্য হারিয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক এই অবনতি সত্ত্বেও ২০২৫ সালের জুলাইয়ের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান তিন ধাপ উন্নত হয়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০০তম।
নতুন সূচকে বাংলাদেশ ও উত্তর কোরিয়া যৌথভাবে ৯৭তম স্থানে রয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে উত্তর কোরিয়ার অবস্থান ছিল ৯৯তম। সর্বশেষ হালনাগাদে দেশটিরও উন্নতি হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার নাগরিকরাও বাংলাদেশিদের মতো ৩৫টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়াই বা সহজ ভিসা সুবিধায় প্রবেশ করতে পারেন। এর মধ্যে প্রায় ৮ থেকে ১০টি দেশে সম্পূর্ণ ভিসামুক্ত প্রবেশের সুযোগ রয়েছে, আর বাকি প্রায় ২৫ থেকে ২৭টি দেশে ভিসা অন অ্যারাইভাল সুবিধা পাওয়া যায়।
হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ১৭টি দেশ ও অঞ্চলে সম্পূর্ণ ভিসামুক্তভাবে ভ্রমণ করতে পারেন। এসব গন্তব্যে আগে থেকে কোনো ভিসা নেওয়ার প্রয়োজন হয় না এবং পৌঁছানোর পরও ভিসার আবেদন করতে হয় না। দেশ ও অঞ্চলগুলো হলো—রুয়ান্ডা, বাহামা, বার্বাডোজ, জাম্বিয়া, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, ডমিনিকা, গ্রেনাডা, হাইতি, জ্যামাইকা, মন্টসেরাট, কুক আইল্যান্ডস, ভানুয়াতু, ফিজি, কিরিবাতি, মাইক্রোনেশিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্য গ্রেনাডিনস এবং ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো।
এ ছাড়া ভিসা অন অ্যারাইভাল সুবিধা রয়েছে আরও ১৪টি দেশে। এসব দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর বা সীমান্ত ইমিগ্রেশন থেকে প্রয়োজনীয় ভিসা সংগ্রহ করা যায়। কিছু দেশে এ জন্য নির্ধারিত ফি দিতে হয়। এই তালিকায় রয়েছে—ভুটান, বুরুন্ডি, মালদ্বীপ, নেপাল, কম্বোডিয়া, তিমুর-লেস্তে, কোমোরোস দ্বীপপুঞ্জ, জিবুতি, গিনি-বিসাউ, মাদাগাস্কার, সিয়েরা লিওন, নিউই, সামোয়া এবং টুভ্যালু।
অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কা, কেনিয়া ও সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসে ভ্রমণের আগে ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ইটিএ) নিতে হয়। অনলাইনে স্বল্প খরচে বা বিনামূল্যে এই অনুমোদন নেওয়া সম্ভব। এটি প্রচলিত কনস্যুলার ভিসা না হলেও যাত্রার আগে বাধ্যতামূলক।
হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের ২০০৬ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬৮তম। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে পাসপোর্টের অবস্থান ক্রমেই অবনতি হয়েছে। ২০১৫ সালে এটি নেমে আসে ৯৯তম স্থানে।
বাংলাদেশের পাসপোর্ট ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে পৌঁছায় ২০২১ সালের জুলাইয়ে, যখন র্যাঙ্কিং নেমে যায় ১০৮তম স্থানে।
এরপর ধীরে ধীরে কিছুটা উন্নতি দেখা যায়। ২০২২ সালে অবস্থান হয় ১০৩তম, ২০২৩ সালে ১০১তম এবং ২০২৪ সালে ৯৭তম। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে আবার নেমে যায় ১০০তম স্থানে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে উন্নতি হয়ে ৯৫তম হলেও জুলাইয়ে আবার দুই ধাপ পিছিয়ে ৯৭তম স্থানে চলে এসেছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ের হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্সে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্টের অবস্থান ধরে রেখেছে সিঙ্গাপুর। দেশটির নাগরিকরা আগাম ভিসা ছাড়াই ১৯২টি দেশে ভ্রমণ করতে পারেন।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এসব দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত বা সহজ প্রবেশযোগ্য গন্তব্য ১৮৮টি।
তৃতীয় স্থানে রয়েছে সুইডেন, যার পাসপোর্ট দিয়ে ১৮৭টি দেশে প্রবেশ করা সম্ভব।
চতুর্থ স্থানে রয়েছে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও স্পেন। এসব দেশের নাগরিকরা ১৮৬টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন।
পঞ্চম স্থানে রয়েছে অস্ট্রিয়া, গ্রিস, মাল্টা, পর্তুগাল ও সুইজারল্যান্ড, যাদের জন্য উন্মুক্ত ১৮৫টি গন্তব্য। ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য। সপ্তম স্থানে আছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চেক প্রজাতন্ত্র, লাটভিয়া, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, স্লোভাকিয়া ও স্লোভেনিয়া। অষ্টম স্থানে রয়েছে ক্রোয়েশিয়া ও এস্তোনিয়া। নবম স্থানে লিচেনস্টেইন ও লিথুনিয়া এবং দশম স্থানে রয়েছে আইসল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র।
ফুটবলের দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা এবারও যৌথভাবে ১৬তম অবস্থানে রয়েছে। দুটি দেশের নাগরিকরা আগাম ভিসা ছাড়াই ১৬৯টি দেশে ভ্রমণ করতে পারেন।
যুদ্ধরত ইউক্রেন রয়েছে ৩১তম এবং রাশিয়া ৪৭তম স্থানে। ইউক্রেনের নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত বা সহজ প্রবেশযোগ্য গন্তব্য ১৪২টি, আর রাশিয়ার ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ১১৪।
ইসরায়েল রয়েছে ১৮তম অবস্থানে, যেখানে দেশটির নাগরিকরা ১৬৬টি দেশে ভ্রমণ করতে পারেন। অন্যদিকে ইরান ও ফিলিস্তিন যৌথভাবে রয়েছে ৯৬তম স্থানে এবং তাদের জন্য ভিসামুক্ত বা সহজ প্রবেশযোগ্য গন্তব্য ৩৭টি।
মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবের অবস্থান ৫৪তম। চীন ও কসোভো যৌথভাবে রয়েছে ৬০তম স্থানে। হাইতি ও ভিয়েতনামের অবস্থান ৮৭তম।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্ট মালদ্বীপের। দেশটি ৫২তম স্থানে রয়েছে এবং তাদের নাগরিকরা ৯৩টি দেশে ভিসামুক্ত বা সহজ প্রবেশ সুবিধা পান। ভারতের অবস্থান ৮১তম, যেখানে ভিসামুক্ত গন্তব্য ৫৫টি। ভুটান রয়েছে ৮৮তম, মিয়ানমার ৯১তম এবং শ্রীলঙ্কা ৯৪তম স্থানে।
বাংলাদেশের ঠিক পরেই ৯৮তম অবস্থানে রয়েছে নেপাল। দেশটির নাগরিকরা ৩৪টি দেশে সহজে ভ্রমণ করতে পারেন।
অন্যদিকে পাকিস্তান রয়েছে ১০১তম স্থানে এবং তাদের জন্য ভিসামুক্ত বা সহজ প্রবেশযোগ্য গন্তব্য ২৯টি। ইরাকের অবস্থান ১০২তম, সিরিয়ার ১০৩তম এবং আফগানিস্তান রয়েছে ১০৪তম স্থানে। সূচকে সবচেয়ে দুর্বল পাসপোর্ট আফগানিস্তানের, যার নাগরিকরা মাত্র ২২টি দেশে আগাম ভিসা ছাড়াই বা সহজ ভিসা সুবিধায় প্রবেশ করতে পারেন।