
ইসরায়েলের যুদ্ধ কখনো শেষ হবে না বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। গত মঙ্গলবার 'চ্যানেল ১৪ নিউজ'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
ইসরায়েলে ব্যাপকভাবে নেতানিয়াহুর নিজস্ব মুখপত্র হিসেবে পরিচিত এই চ্যানেলে তিনি একটি বিরল ও দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে এই অঞ্চলে ইসরায়েলের যুদ্ধগুলো শেষ হচ্ছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে নেতানিয়াহু স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন যে, তাদের সামরিক অভিযান চলতেই থাকবে।
হামাস ও হিজবুল্লাহ নেতাদের হত্যা এবং গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছি।”
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা দুটি যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা ভয়ের দেয়াল ভেঙে দিয়েছি। ৪৭ বছর ধরে কেউ ইরানকে আক্রমণ করার সাহস দেখায়নি।”
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার পর নেতানিয়াহুর ঘোষিত ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয়’-এর লক্ষ্যটি এখনো অর্জন করা সম্ভব কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এর কোনো শেষ নেই।”
নেতানিয়াহু বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে এবং এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে আপনাকে অত্যন্ত শক্তিশালী হতে হবে।” এর সাথে তিনি আরও যোগ করেন, “ইসরায়েল এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।”
সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল তার যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে—এটা “কেউই বিশ্বাস করেনি”। এরপর তিনি সাথে সাথেই উপস্থিত দর্শকদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “কেউ কি হাততালি দিচ্ছেন না?” তখন দর্শকেরা তালি দিয়ে তাঁর কথায় সায় দেন।
সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহুর কাছে আরও জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, গাজার বাসিন্দাদের ‘দেশছাড়া’ করার বিষয়টি এখনও তাদের পরিকল্পনায় আছে কি না।
তিনি তখন প্রশ্নকর্তার শব্দ চয়ন শুধরে দিয়ে বলেন, “স্বেচ্ছামূলক অভিবাসন”। উল্লেখ্য, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিকে ভদ্র ভাষায় আড়াল করতে ইসরায়েল এই শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। এরপর তিনি যোগ করেন: “আমি কম কথা বলে বেশি কাজ করতে পছন্দ করি।”
গাজায় ইহুদি বসতি স্থাপন নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী একই কায়দায় উত্তর দিয়ে বলেন: “আসল কথা হলো কাজ করা উচিত, নাকি কথা বলা উচিত।”
নেতানিয়াহু জানান, ইসরায়েল বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের চাপের মুখে রয়েছে। আর তাই, “আমাকে প্রতি মুহূর্তে এবং প্রতিটি বিষয়ে পুরো পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ করার দরকার নেই।”
জরিপের তথ্য: ইসরায়েলি শিক্ষার্থীরা এখন আরও বেশি বর্ণবাদী
গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথমবার আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে ইসরায়েলি শিক্ষার্থীরা ভোট দেবে। তবে ইসরায়েলি সংবাদপত্র 'হারেৎস'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানের গ্র্যাজুয়েট বা স্নাতকেরা তাদের আগের প্রজন্মের চেয়েও বেশি বর্ণবাদী।
ইসরায়েলের এই দৈনিকটি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানকার কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বেড়েছে। যুবকর্মী ও শিক্ষাবিদেরা এই পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন।
ইসরায়েলের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের করা এক জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এমন ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে যারা মনে করে যে—ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মতো কিছু গোষ্ঠী রয়েছে, যারা এই সমাজের অংশ হওয়ার যোগ্য নয়।
জরিপের তথ্যমতে, ধর্মীয় বিদ্যালয়গুলোর ৫২ শতাংশ শিক্ষার্থী এই বৈষম্যমূলক ধারণাকে সমর্থন করেছে। অন্যদিকে সাধারণ (ধর্মনিরপেক্ষ) বিদ্যালয়ের ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী একই মত দিয়েছে। আর আরবি-ভাষী বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৩৪ শতাংশ।
ইহুদি শিক্ষার্থীদের এই মানসিক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে একটি যুব আন্দোলনের কর্মকর্তা 'হারেৎস'-কে বলেন, “শিক্ষার্থীদের মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবোধ আরও জোরালো হয়েছে। সেই সাথে একটি শক্তিশালী ইহুদি পরিচয়ের আকাঙ্ক্ষা এবং সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার ইচ্ছাও বেড়েছে।”
আরেকজন যুব সংগঠক জানান, ইহুদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরবদের নিয়ে ভয় বাড়ছে। তবে তিনি মনে করেন, এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাদের আস্থা কমে যাওয়া।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্ণবাদী মনোভাব এবং গণতন্ত্রের প্রতি আস্থার অভাবের পাশাপাশি ইসরায়েলের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে পাস করা ইহুদি তরুণরা বিশ্বাসই করে না যে ফিলিস্তিনিদের সাথে কখনো শান্তি স্থাপন সম্ভব।
একটি ইহুদি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, পাস করে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা “দুই জাতির এই সংঘাতের কোনো শান্তিপূর্ণ বা রাজনৈতিক সমাধানে বিশ্বাস করে না”।
মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয়
একটি জরিপে দেখা গেছে যে, ইসরায়েলি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বর্ণবাদী মনোভাব এখন আরও বেড়েছে। অন্যদিকে আরেকটি গবেষণায় উঠে এসেছে, সে দেশের বিপুল সংখ্যক শিশু পিটিএসডি (মানসিক আঘাত-পরবর্তী মানসিক ব্যাধি)-তে ভুগছে।
গত বুধবার সংবাদমাধ্যম 'ওয়াইনেট' জানায়, নতুন একটি ইসরায়েলি গবেষণায় দেশটির রিজার্ভ (সংরক্ষিত) সৈন্যদের সন্তানদের ওপর যুদ্ধের ভয়াবহ মানসিক প্রভাব নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
রাইখম্যান বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রায় ২,৫০০ পরিবারের ওপর পরিচালিত এই জরিপ অনুসারে, সাত বছরের কম বয়সী বেশিরভাগ শিশুর মধ্যেই পিটিএসডি (মানসিক আঘাত-পরবর্তী মানসিক ব্যাধি)-র লক্ষণ দেখা গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, রিজার্ভিস্টদের ৭৫ শতাংশ সন্তান পিটিএসডি-র প্রাথমিক বা উপ-ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে ভুগছে। আর যাদের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ স্পষ্ট, তাদের প্রায় ৩২ শতাংশ মারাত্মক বা ক্লিনিক্যাল পিটিএসডি-তে আক্রান্ত।
গবেষণায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে যে, শিশুরা মানসিক ও শারীরিকভাবে তীব্র কষ্টে ভুগছে। যথাযথ চিকিৎসা না হলে “এর মাশুল আগামী বহু বছর ধরে ইসরায়েলি সমাজকে গুনতে হবে।”
রাইখম্যান ইউনিভার্সিটি জানিয়েছে, শুধু যে শিশুরাই পিটিএসডি-তে ভুগছে তা নয়। জরিপে অংশ নেওয়া বাবাদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ এবং মায়েদের মধ্যে ৪২ শতাংশ বিভিন্ন মাত্রার মানসিক ট্রমা বা আঘাতে ভুগছেন।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রায় তিন বছর ধরে চলা এই যুদ্ধের পর ইসরায়েল “একটি বিপর্যস্ত জাতিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ছোট সন্তান লালন-পালনকারী সংরক্ষিত সেনাদের পরিবারগুলো চরম দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।”
সমীক্ষা অনুযায়ী, “ছোট সন্তানসহ রিজার্ভিস্ট পরিবারগুলোর ভেতরের পরিস্থিতি মাঝে মাঝে চরম বিশৃঙ্খল রূপ নেয়।” বর্তমানে ইসরায়েল “মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার এক সুনামির” মুখোমুখি হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুরা যেখানে ঘুমের সমস্যা, বিছানায় প্রস্রাব করা, সহিংস আচরণ ও অন্যান্য সমস্যায় ভুগছে; সেখানে ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে এই রিজার্ভিস্টদের পরিবারগুলো সামগ্রিকভাবেই সংকটে পড়েছে।
সমীক্ষায় পরিশেষে বলা হয়েছে, “প্রায় ৮০ শতাংশ অভিভাবক জানিয়েছেন যে, তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে।”
সূত্র: মিডিল ইস্ট আই