
রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেনের সম্মুখ সমরে অংশ নিতে ইয়েমেনের শত শত তরুণকে প্রলুব্ধ করছে মস্কো। গৃহযুদ্ধ-বিধ্বস্ত ইয়েমেনের চরম অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্বকে পুঁজি করে মোটা অঙ্কের অর্থ, আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা এবং রাশিয়ান নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওমান সীমান্ত সংলগ্ন আল-মাহরাহ প্রদেশের একটি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে ইয়েমেনি যুবকদের রাশিয়ায় পাচার করা হচ্ছে। এদের বেশিরভাগই ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলের বাসিন্দা। তবে এই যুবকদের ইয়েমেন ছাড়ার সময় বলা হচ্ছে যে, তাদের রাশিয়ায় কোনো সামরিক বাহিনীতে নেওয়া হচ্ছে না, বরং অত্যন্ত আকর্ষণীয় বেতনে ‘নিরাপত্তা রক্ষী’ (Security Guard) হিসেবে চাকরি দেওয়া হচ্ছে।
লোভনীয় প্রস্তাব এবং আসল বাস্তবতা
রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর এই তরুণদের একটি সামরিক চুক্তিপত্রে সই করতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ রাশিয়ান ভাষায় লেখা। আরবি অনুবাদ ছাড়া এই চুক্তিতে কী লেখা আছে, তা বুঝতে না পেরেই সরল বিশ্বাসে সই করছেন ইয়েমেনি যুবকরা। চুক্তির প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে:
তাৎক্ষণিকভাবে এককালীন ২,০০০ মার্কিন ডলার বোনাস।
প্রতি মাসে ২,০০০ মার্কিন ডলারেরও বেশি নিয়মিত বেতন।
রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে নিজের এবং পরিবারের জন্য রাশিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ।
কিন্তু ইয়েমেনি তরুণরা যখন রাশিয়ায় পৌঁছান, তখন তাদের স্বপ্ন দ্রুতই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণের পরই তাদের কোনো নিরাপত্তা চৌকিতে নয়, বরং সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক ফ্রন্টলাইন বা সম্মুখ সমরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে এই যুদ্ধে বেশ কয়েকজন ইয়েমেনি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং অনেকেই গুরুতর আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
নেপথ্যে ওমান-ভিত্তিক ট্রাভেল এজেন্সি ও আল-মাহরাহর চোরাচালান চক্র
এই মানব পাচার ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে ইয়েমেনের পূর্ব সীমান্তবর্তী প্রদেশ আল-মাহরাহ। ওমানের মাস্কাট-ভিত্তিক একটি ট্রাভেল এজেন্সির নেটওয়ার্ক এই পুরো চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করছে। ইয়েমেনের বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দার কারণে হাজার হাজার সাবেক সেনাসদস্য এবং সাধারণ বেকার যুবক এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন।
মধ্যস্থতাকারীরা এই তরুণদের প্রথমে ওমান হয়ে রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য ট্যুরিস্ট ভিসার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। এরপর মস্কোয় পৌঁছালে রুশ সামরিক কর্মকর্তাদের একটি দল তাদের রিসিভ করে সরাসরি ব্যারাকে নিয়ে যাচ্ছে। ইয়েমেনের স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, গত কয়েক মাসে শত শত তরুণ এই পথ ধরে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছে, যাদের বড় অংশই এখন ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে আটকা পড়ে আছে।
হুথি বনাম সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলের সমীকরণ
মজার বিষয় হলো, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে লড়তে যাওয়া এই যুবকদের বেশিরভাগই হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকার বাসিন্দা নন, বরং তারা ইয়েমেনের বৈধ সরকারের অধীনে থাকা দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের অধিবাসী। যদিও হুথিরা প্রকাশ্যেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত, তবুও এই নির্দিষ্ট রিক্রুটমেন্ট ড্রাইভটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অপরাধী চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ইয়েমেনের সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী আল-মাহরাহ অঞ্চলে এই চক্রের বেশ কয়েকজন এজেন্টকে গ্রেপ্তার করলেও পাচার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
‘নিরাপত্তা রক্ষী’ থেকে ‘যুদ্ধের ঢাল’
যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা কয়েকজন ইয়েমেনি যুবকের আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, ফ্রন্টলাইনে পাঠানো এই তরুণদের আধুনিক যুদ্ধের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। ড্রোন হামলা এবং ভারী আর্টিলারির মুখে রুশ কমান্ডাররা তাদের একপ্রকার ‘যুদ্ধের ঢাল’ বা ক্যানন ফডার (Cannon Fodder) হিসেবে ব্যবহার করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যাপক সেনা ক্ষয়ের মুখোমুখি হয়ে রাশিয়া এখন এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দরিদ্র দেশগুলো থেকে অর্থের বিনিময়ে ভাড়াটে যোদ্ধা সংগ্রহ করছে। ইয়েমেনের এই যুবকরা মূলত আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং দেশের অভ্যন্তরে চলমান দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্যের নির্মম শিকার।