
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে একের পর এক হামলায় ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্র যেন ভেঙে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক যৌথ সামরিক অভিযানে দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মৃত্যু তেহরানের ক্ষমতার কাঠামোকে নজিরবিহীন সংকটে ফেলেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এসব হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি থেকে শুরু করে সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকরা প্রাণ হারিয়েছেন। এর ফলে দেশের প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের শূন্যতা।
এই সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনেও অস্থিরতা তৈরি করেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে নিজ বাসভবনে বিমান হামলায় নিহত হন ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, যিনি ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দেশের নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব গভীর সংকটে পড়েছে।
একই দিনে পৃথক হামলায় ইরানের সামরিক নেতৃত্বেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস আইআরজিসি প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ নিহত হন। এছাড়া সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবদোলরহিম মুসাভি তেহরানে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সময় হামলার শিকার হয়ে মারা যান। সামরিক কৌশল নির্ধারণ ও বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এই নেতাদের মৃত্যু বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা এবং পারমাণবিক ও নিরাপত্তা নীতির গুরুত্বপূর্ণ স্থপতি আলি শামখানিও ২৮ ফেব্রুয়ারির ওই হামলায় নিহত হন।
মার্চ মাসজুড়েও হামলার ধারা অব্যাহত থাকে। ১৭ মার্চ পারদিস এলাকায় বিমান হামলায় নিহত হন সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রভাবশালী নেতা আলী লারিজানি। এ সময় তার ছেলে এবং এক সহযোগীও নিহত হন। দীর্ঘদিন ধরে খামেনির বিশ্বস্ত উপদেষ্টা হিসেবে ইরানের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। একই দিনে বাসিজ প্যারামিলিটারি বাহিনীর প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানিও নিহত হন।
এর পরদিন বুধবার ১৮ মার্চ ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারান ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খতিব। কঠোরপন্থী এই ধর্মীয় নেতা খামেনির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং দেশের গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনায় তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের এত বড় অংশ একসঙ্গে হারানো ইরানের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। এই পরিস্থিতি দেশটির প্রশাসনিক কাঠামোয় গভীর সংকট তৈরি করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।