
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আবারও রক্তক্ষয়ী মোড় নিয়েছে। ইরানের মধ্যাঞ্চলের শহর ইসফাহানে একটি শিল্প কারখানায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম। একই সময়ে ইরানও ইসরায়েলের দিকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, ফলে দুই পক্ষের সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। এ তথ্য জানিয়েছে আল জাজিরা।
ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসফাহানের একটি শিল্প এলাকায় হামলার সময় কারখানার ভেতরে শ্রমিকরা কাজ করছিলেন। ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে ঘটনাস্থলেই অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়।
আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, শনিবার ইসফাহানে অবস্থিত একটি হিটিং ও কুলিং সরঞ্জাম তৈরির কারখানাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। সংস্থাটি এই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বাহিনীকে দায়ী করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর শনিবার ছিল সংঘাতের ১৫তম দিন। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে দেশে অন্তত ১ হাজার ৪৪৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আহতের সংখ্যা ১৮ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের বিভিন্ন শহর একের পর এক হামলার শিকার হচ্ছে। গত ৮ মার্চ ইসফাহানে রাশিয়ার কনস্যুলেট ভবনে গোলাবর্ষণের ঘটনায় ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েকজন কর্মী আহত হন। মস্কো তখন এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক চুক্তির ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে আখ্যা দেয়।
শনিবার ইরানের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলমান হামলায় দেশের অন্তত ৫৬টি জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসফাহানের ১৭শ শতাব্দীর ঐতিহাসিক কেন্দ্র নকশে জাহান স্কয়ার এবং তেহরানের ইউনেস্কো স্বীকৃত গোলেস্তান প্যালেস।
ইউনেস্কো জানিয়েছে, ইরানের ২৯টি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মধ্যে চারটি এই সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতি নিয়ে সংস্থাটি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এদিকে ইরানের সেনাবাহিনী নিশ্চিত করেছে যে ইসরায়েলি হামলায় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ জালালি-নাসাব নিহত হয়েছেন। সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশ রক্ষার সময় তিনি ‘শহিদ’ হয়েছেন।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী খার্গ দ্বীপে হামলা চালায়। ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এই দ্বীপের মাধ্যমেই হয়। তবে এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হামলার পরও সেখানে কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে এবং কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে থাকে, তাহলে খার্গ দ্বীপের তেল অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হতে পারে।
সংঘাত থামাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও আপাতত থমকে আছে। রয়টার্স জানিয়েছে, আঞ্চলিক কয়েকটি দেশের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করেছে। হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আপাতত সে বিষয়ে আগ্রহী নন এবং সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার দিকেই মনোযোগ দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে তিনি আলোচনায় আগ্রহী নন। আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে আমাদের মিশন চালিয়ে যাব।’
অন্যদিকে ইরানও জানিয়েছে, হামলা চলতে থাকলে তারা কোনো ধরনের আলোচনায় অংশ নেবে না।
শনিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো যে ‘ফাঁকফোকরে ভরা’, তা প্রমাণিত হয়েছে। তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি ‘বিদেশি আগ্রাসীদের বহিষ্কার’ করার আহ্বান জানান।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেন, যুদ্ধ এখন একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে’ প্রবেশ করেছে এবং ‘যতদিন প্রয়োজন থাকবে, ততদিন তা চলবে’।
এদিকে শনিবার ইরান আবারও ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এএফপির প্রতিবেদকদের তথ্য অনুযায়ী, জেরুজালেমের আকাশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ছয় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে এবং এর কিছুতে ক্লাস্টার বোমা ওয়ারহেড ব্যবহার করা হয়েছে।
ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, ইলাত শহরে একটি ক্লাস্টার গোলাবারুদের আঘাতে তিনজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১২ বছর বয়সী এক শিশুও রয়েছে।