
ন্যাটোর প্রতি আস্থার প্রশ্ন তুলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনো সংকটে পড়লে জোটভুক্ত দেশগুলো আদৌ পাশে দাঁড়াবে কি না—তা তিনি নিশ্চিত নন। আফগানিস্তান যুদ্ধে ন্যাটো মিত্রদের ভূমিকা নিয়েও তিনি খোঁচা দিয়ে মন্তব্য করেন, জোটের সেনারা সামনের সারিতে না থেকে পেছনে অবস্থান করেছিল।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ফাঁকে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি সব সময়ই বলে এসেছি, আমাদের কখনো দরকার হলে তারা কি থাকবে? এটাই চূড়ান্ত পরীক্ষা। আমি নিশ্চিত নই। আমি জানি, আমরা থাকতাম বা থাকব। কিন্তু তারা কি থাকবে?’
এই বক্তব্য ন্যাটোভুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে এমন সময়ে মন্তব্যটি এলো, যখন গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়ে ট্রাম্প ডেনমার্কের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি করেছেন—ডেনমার্কও ন্যাটোর সদস্য।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর প্রথমবারের মতো ন্যাটোর ঐতিহাসিক অনুচ্ছেদ ৫ কার্যকর হয়েছিল। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জোটের কোনো এক সদস্যের ওপর হামলা মানে সব সদস্যের ওপর হামলা।
এরপর প্রায় দুই দশক ধরে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো ও সহযোগী দেশগুলোর সেনারা যুদ্ধ চালায়। তবে ট্রাম্প বরাবরের মতোই এই যুদ্ধে মিত্রদের ত্যাগ ও ভূমিকার গুরুত্ব কমিয়ে দেখান।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমাদের কখনো তাদের প্রয়োজনই পড়েনি। আমরা কখনো সত্যিকার অর্থে কিছু চাইনি। তারা বলবে, আফগানিস্তানে কিছু সেনা পাঠিয়েছিল। হ্যাঁ, পাঠিয়েছিল কিন্তু তারা সামনের সারিতে ছিল না।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তান যুদ্ধে ন্যাটোর মিত্র দেশগুলোর মোট প্রায় ৩ হাজার ৫০০ সেনা নিহত হন। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৫৬ জন ছিলেন মার্কিন সেনা এবং ৪৫৭ জন ব্রিটিশ সেনা। জনসংখ্যার তুলনায় ক্ষতির হার অনেক ইউরোপীয় দেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সমান বা কাছাকাছি ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, অভিযান শুরুর সময় ডেনমার্কের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ লাখ, অথচ দেশটি যুদ্ধে ৪০ জনের বেশি সেনা হারায়—যা অনুপাতগতভাবে বড় ত্যাগ হিসেবে বিবেচিত।
ট্রাম্পের মন্তব্যের জবাবে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে দাভোসেই সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানান। ট্রাম্পের পাশেই বসে তিনি বলেন, ‘আপনি বলেছেন ইউরোপীয়রা যুক্তরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে পাশে দাঁড়াবে কি না? আপনি নিশ্চিত নন। আমি আপনাকে স্পষ্ট করে বলছি, তারা দাঁড়াবে এবং তারা আফগানিস্তানে দাঁড়িয়েছিল।’
রুটে আরও বলেন, ‘প্রতি দুইজন মার্কিন সেনার বিনিময়ে একজন করে অন্য ন্যাটো দেশের সেনা আর পরিবারের কাছে ফিরে আসেনি। এটা গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি মনে করেন সেটি গুরুত্বহীন, তাহলে তা বেদনাদায়ক।’
ট্রাম্পের বক্তব্যে যুক্তরাজ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দলমত নির্বিশেষে ব্রিটিশ রাজনীতিকরা একে অপমানজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি বলেন, ‘ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ মাত্র একবারই সক্রিয় হয়েছে, আর তখন যুক্তরাষ্ট্রের ডাকে যুক্তরাজ্যসহ মিত্ররা সাড়া দিয়েছিল। আফগানিস্তানে ৪৫০ জনের বেশি ব্রিটিশ সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। তারা ছিলেন আমাদের জাতির জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীর।’
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির চেয়ার এমিলি থর্নবেরি ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘চরম অপমান’ বলে আখ্যা দেন। বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির নেত্রী কেমি ব্যাডেনকও বলেন, ‘এই বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মিত্রদের ত্যাগকে সম্মান করা উচিত, অবমূল্যায়ন নয়।’
শুধু ট্রাম্প নন, তার প্রশাসনের অন্য সদস্যরাও অতীতে ন্যাটো মিত্রদের ভূমিকা নিয়ে অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য করেছেন। গত জুনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছিলেন, ‘অনেক পতাকা দেখা যেত, কিন্তু লড়াইয়ের মাঠে বাস্তব সামরিক সক্ষমতা ছিল খুব কম।’
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ধারাবাহিক মন্তব্য ন্যাটোর ঐক্য ও পারস্পরিক আস্থাকে দুর্বল করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এই সামরিক জোট ভবিষ্যতে কতটা ঐক্যবদ্ধ থাকবে এবং সংকটকালে সদস্য দেশগুলো একে অপরের পাশে কতটা দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে—সে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে উঠছে।