
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ব্যক্তিগত বাসভবনে ড্রোন হামলার ঘটনা ইউক্রেন যুদ্ধকে নতুন মাত্রার ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিয়েছে। ২৯ ডিসেম্বর রাশিয়ার নভগোরড অঞ্চলে অবস্থিত এই বাসভবন লক্ষ্য করে হামলার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও যুদ্ধবিরতি নিয়ে চলমান আলোচনায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নভগোরডে ডলগিয়ে বোরোডি নামে পরিচিত, ভলদাই হিসেবেও পরিচিত পুতিনের এই বাসভবনে একাধিক দফায় ড্রোন আঘাত হানে। মস্কো সরাসরি ইউক্রেনকে দায়ী করলেও কিয়েভ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবু এই ঘটনাকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক ডেপুটি আন্ডার সেক্রেটারি ও এশিয়া টাইমসের বিশেষ সংবাদদাতা স্টিফেন ব্রায়েন তার বিশ্লেষণে লিখেছেন, এই হামলাটি এমন সময়ে ঘটেছে, যখন ইউক্রেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তার মতে, এ ধরনের উসকানিমূলক পদক্ষেপ ইউক্রেনে মার্কিন সেনা মোতায়েনের যুক্তিকে গুরুতর প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
হামলার পরিপ্রেক্ষিতে জানা যায়, ২৯ ডিসেম্বর নভগোরড অঞ্চলে পুতিনের অন্যতম সুরক্ষিত বাসভবন লক্ষ্য করে ড্রোন পাঠানো হয়। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ ও প্রেসিডেন্ট পুতিন নিজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে টেলিফোনে বিষয়টি জানান। ইউক্রেন দায় অস্বীকার করলেও রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কয়েকটি স্বাধীন সূত্র হামলার পক্ষে প্রমাণ থাকার দাবি করেছে।
রাশিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ব্রায়ানস্ক অঞ্চলে ৪৯টি এবং নভগোরড অঞ্চলে ৪১টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। হামলায় ব্যবহৃত প্রধান ড্রোন ছিল ইউক্রেনীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ইউজে-২৬ বিভার, যার আঘাত হানার সক্ষমতা প্রায় এক হাজার কিলোমিটার। এই ড্রোন আগেও মস্কোতে হামলার ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছিল। পাশাপাশি একটি চীনা ইঞ্জিনচালিত চাকলুন ড্রোন উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে রাশিয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুতিনের এই বাসভবন বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকাগুলোর একটি। সেখানে প্যান্টশির এস-১ ও এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন রয়েছে। ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতার অংশ হিসেবে ক্র্যাসুখা-৪ ও পোল-২১ই জ্যামার ব্যবহার করা হয়, যা জিপিএস সংকেত ও অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারে। এত কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও ড্রোন পৌঁছানোয় প্রশ্ন উঠেছে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে। স্টিফেন ব্রায়েনের ধারণা, ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো স্টারলিংক মিনি টার্মিনাল ব্যবহার করতে পারে। স্টারলিংক জ্যাম করা অত্যন্ত কঠিন হওয়ায় রাশিয়ার ইলেকট্রনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এতে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত মিলছে।
এই হামলা সম্পর্কে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি কতটা জানতেন, সেটিও বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। ঘটনাটি ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের মার-আ-লাগোতে ট্রাম্পের সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। লেখক ল্যারি জনসনের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেন, এটি জেলেনস্কির অজান্তেই ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬-এর যৌথ অভিযান হতে পারে। এর উদ্দেশ্য হতে পারে শান্তি আলোচনা ব্যাহত করা এবং জেলেনস্কিকে সরিয়ে ভ্যালেরি জালুঝনিকে ক্ষমতায় আনার পথ সুগম করা।
যদি জেলেনস্কি হামলার বিষয়ে অবগত থেকে থাকেন, তবে তা তার দ্বৈত অবস্থানকেই সামনে আনে। একদিকে শান্তির কথা বলা, অন্যদিকে পুতিনকে সরাসরি লক্ষ্য করা। আর যদি তিনি না জানেন, তবে স্পষ্ট হয় যে ইউক্রেনের সামরিক বা গোয়েন্দা কাঠামোর ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। স্টিফেন ব্রায়েনের মতে, দুই পরিস্থিতিই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বৈঠকে আলোচিত ১৫ বছরের নিরাপত্তা গ্যারান্টির প্রস্তাব নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জেলেনস্কি চান এই নিশ্চয়তার অংশ হিসেবে ইউক্রেনে মার্কিন সেনা মোতায়েন হোক, যাকে তিনি ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’ নামে অভিহিত করেছেন।
স্টিফেন ব্রায়েন এ বিষয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তার প্রশ্ন, ইউক্রেন যখন রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডে এবং প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত বাসভবনে হামলা চালাচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র কেন তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে। তার মতে, মার্কিন সেনা মোতায়েন মানে রুশ পাল্টা হামলার ক্ষেত্রে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নেওয়া। এমন পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে অনিচ্ছাকৃত পারমাণবিক সংঘাতের দিকেও ঠেলে দিতে পারে।
ব্রায়েন জেলেনস্কির প্রস্তাবিত নিরাপত্তা জোটকে ‘স্ট্রিমলাইন্ড ন্যাটো’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ব্যাখ্যায়, এতে হাঙ্গেরির মতো দেশগুলো বাদ দিয়ে জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে একটি জোট গড়া হবে, যেখানে কোনো দেশের ভেটো দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। তার মতে, ন্যাটোতে ইউক্রেনকে অন্তর্ভুক্ত করার চেয়েও এই ধরনের দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী সম্মিলিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হলেও ব্যক্তিগত গ্যারান্টি যুক্তরাষ্ট্রকে এককভাবে যুদ্ধের দায় নিতে বাধ্য করতে পারে।
পুতিনের বাসভবনে ড্রোন হামলাকে ক্রেমলিন চরম প্ররোচনা হিসেবে দেখছে এবং একে হত্যাচেষ্টার শামিল বলেও বিবেচনা করছে। এর ফলে রাশিয়ার পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিশোধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা যে কোনো শান্তি উদ্যোগকে ভেস্তে দিতে পারে। রাশিয়ার অভ্যন্তরে এমন ধারণাও জোরালো হতে পারে যে, ইউক্রেনের বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে সমঝোতা সম্ভব নয়।
স্টিফেন ব্রায়েনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই হামলা ইউক্রেন যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে পারে। এতে বোঝা যায়, ইউক্রেনীয় পক্ষ বা তাদের একটি অংশ যুদ্ধবিরতির চেয়ে সংঘাত আরও বিস্তৃত করতে আগ্রহী। এমন বাস্তবতায় ইউক্রেনে মার্কিন সেনা মোতায়েন বা ১৫ বছরের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি হতে পারে।
তিনি পরোক্ষভাবে ট্রাম্প প্রশাসনকে সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণহীন কর্মকাণ্ড মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত না করে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়া হলে তা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলবে। এই ঘটনাই মনে করিয়ে দেয়, যখন ছায়াযুদ্ধ রাষ্ট্রপ্রধানের বাসভবন পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন কূটনৈতিক সমাধানের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং বিশ্ব আরও ভয়াবহ সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়।