
গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এইডস আক্রান্ত শনাক্তের হার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০২০ সালে যেখানে শনাক্ত হয়েছিলেন ৬৫৮ জন, ২০২৪ সালে এসে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৩৮। বয়সভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ২৫-৪৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকসেবীদের মধ্যে ইনজেকশনের পুনর্ব্যবহার, ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, অভিবাসীদের মাধ্যমে ভাইরাসের আগমন এবং পর্যাপ্ত পরীক্ষা না হওয়ার মতো কারণে দেশে সংক্রমণের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।
জাতীয় এইডস/এসটিডি কন্ট্রোল থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০২০ সালে দেশে ৬৫৮ জনের মধ্যে এইডস সংক্রমণ ধরা পড়ে। এর মধ্যে ৪৪৫ জন পুরুষ, ১৯৯ জন নারী এবং ১৪ জন তৃতীয় লিঙ্গের। ২০২১ সালে ৭২৯ জনের এইডস শনাক্ত হয়। যার মধ্যে ৪৮৪ জন পুরুষ, ২৩২ জন নারী এবং ১৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের। ২০২২ সালে এইডসে শনাক্ত হয় ৯৪৭ জন। তাদের মধ্যে ৬৬৮ জন পুরুষ, ২৭১ জন নারী এবং আটজন তৃতীয় লিঙ্গের। ২০২৩ সালে দেশে মোট ১ হাজার ২৭৬ জনের এইডস ধরা পড়ে। এর মধ্যে পুরুষ ৯৫৩ জন, নারী ৩০৭ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ১৬ জন। সব শেষ গত বছর ২০২৪ সালে মোট ১ হাজার ৪৩৮ জনের এইডস সংক্রমণ ধরা পড়ে। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১১০, নারী ৩১৩ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ১৫।
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বাসিন্দা ইউসুফ আলী (ছদ্মনাম)। দীর্ঘদিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। সেই সঙ্গে ছিল মাথাব্যথা, গলা ব্যথা ও শুকনো কাশি। পরে চিকিৎসকের কাছে গেলে তাকে এইচআইভি পরীক্ষা করতে দেয়া হয়। ফলাফল পজিটিভ আসে তার। ইউসুফ আলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায় দীর্ঘদিন ধরে তিনি মাদক সেবন করতেন। একই ইনজেকশন একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করতেন।
সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার রায় বলেন, ‘জেলায় ভয়াবহ আকারে এইচআইভি পজিটিভে (এইডস) আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিগত বছরগুলোর তুলনায় গত দুই বছর পজিটিভ রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। আক্রান্তদের মধ্যে মাদকসেবীর সংখ্যাই বেশি। যারা সুইয়ের মাধ্যমে মাদক নিতেন। এছাড়া যৌনকর্মী, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘হাসপাতালে পরীক্ষার ব্যবস্থাসহ চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু অনেকেই সমাজ ও লোকলজ্জার ভয়ে পরীক্ষা করাতে চান না বা চিকিৎসায় আগ্রহী হন না। এ কারণে আক্রান্ত দ্রুত ছড়াচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনজেকশন ব্যবহারকারী মাদকাসক্তদের মাধ্যমে যাতে এইডস ছড়াতে না পারে সেজন্য মাদকসেবীদের মধ্যে, পরিবারে, সমাজে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। এছাড়া শনাক্তদের জন্য পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং ও মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে। যে কারণে তাদের মাধ্যমে এইডস রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
এইডস আক্রান্তদের মূলত চারটি বয়স স্তরে ভাগ করে পরিসংখ্যান তৈরি করে এসটিডি। সেগুলো হলো ০-১৪, ১৫-২৪, ২৫-৪৯ ও ৫০-ঊর্ধ্ব। গত পাঁচ বছরে ২৫-৪৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এইডস সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। এ বয়সীদের মধ্যে ৪ হাজার ৪৪৮ জনের এইডসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। তাছাড়া ১৫-২৪ বছর বয়সী ১ হাজার ৫৬ জন, ৫০-ঊর্ধ্বদের মধ্যে ৬০৬ জন এবং ০-১৪ বছর বয়সী ২৫৩ জনের মধ্যে এইডস সংক্রমণ ধরা পড়েছে।
ঢাকা মেডিকেলে আরপি ইনচার্জ ডা. ইয়াসির আরাফাত অভি বলেন, ‘এইডস রোগী শনাক্ত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ আগে থেকে এখন অনেক বেশি পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া আগের তুলনায় মাদকসেবীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। যাদের মাধ্যমে এইচআইভি ভাইরাসের সংক্রমণ আবার নতুন করে দেখা দিয়েছে। দেশের বাইরে থেকে যারা আসছে তারাও এ ভাইরাস নিয়ে আসছে। এসব কারণে বর্তমানে এইচআইভি পজিটিভ রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে। আরেকটি বিষয় যেটি আমরা লক্ষ করছি তা হলো রোহিঙ্গাদের মধ্যেও এ সংক্রমণের হার বাড়ছে। এসব দিকে যদি নজর দেয়া হয় তাহলে আক্রান্তের হার অনেকাংশে কমে যাবে।’
জাতীয় এইডস/এসটিডি কন্ট্রোলের উপপরিচালক ডা. জুবাইদা নাসরীন বলেন, ‘মূলত বর্তমানে ডায়াগনসিসের পরিমাণ বেড়ে গেছে। যার কারণে সংখ্যাটাও বাড়ছে। এ রোগ নিয়ন্ত্রণে বেশি বেশি করে পরীক্ষা করানো জরুরি। আমরা এইচআইভি পরীক্ষা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছি। কারণ এইচআইভি শনাক্ত হওয়ার মাধ্যমেই কিন্তু আক্রান্তের সংখ্যা কমানো যাবে। আরেকটি ব্যাপার হলো অভিবাসীদের মাধ্যমে এ রোগের প্রকোপ বেশি ছড়ায়। সেদিকটিও আমরা নজরে রাখছি। যে কারণে যারা বাইরে থেকে আসছে তাদের এইচআইভি পরীক্ষা জোরদার করার চেষ্টা করছি। কারণ রোগটি যত বেশি শনাক্ত করা যাবে, তত বেশি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।’