
নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগের অবিসংবাদিত কিংবদন্তি চার্লি চ্যাপলিনকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে আজও ভালবাসা আর শ্রদ্ধার শেষ নেই। ১৬ এপ্রিল (বৃহস্পতি) তার জন্মদিনকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তার জীবনের এমন কিছু অজানা ও চমকপ্রদ ঘটনা, যা শুধু একজন শিল্পীর নয়, এক সংগ্রামী মানুষের পূর্ণ জীবনকথা তুলে ধরে।
চার্লি চ্যাপলিনের জন্ম হয় এক শিল্পী পরিবারে। বাবা-মা দুজনেই লন্ডনের মিউজিক হলে পারফর্ম করতেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মায়ের অসুস্থতার কারণে হঠাৎ করেই মঞ্চে উঠে পড়েন তিনি। সেই প্রথম পারফরম্যান্সেই গান আর হাস্যরস দিয়ে দর্শকের মন জয় করেন চ্যাপলিন, যা তার ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
শৈশব তার জন্য ছিল কঠিন অভিজ্ঞতায় ভরা। আর্থিক সংকটের কারণে তাকে ও তার ভাইকে এক আবাসিক বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়, যেখানে দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়। এই সময়েই তার জীবনে দারিদ্র্য ও একাকিত্বের গভীর ছাপ পড়ে, কারণ তার মা মানসিক অসুস্থতায় ভুগতে থাকেন এবং বাবা অল্প বয়সেই মারা যান।
১৯১৪ সালে ‘মেকিং আ লিভিং’ নামের একটি চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম বড় পর্দায় আসেন। কিন্তু নিজের অভিনয় দেখে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, তার পারফরম্যান্স কৃত্রিম হয়ে গেছে এবং পরিচালক তার স্বাভাবিকতা নষ্ট করেছেন।
এরপরই জন্ম নেয় তার জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত সৃষ্টি ‘লিটল ট্র্যাম্প’ চরিত্র। ঢিলেঢালা প্যান্ট, ছোট টুপি, লাঠি আর অদ্ভুত গোঁফের এই চরিত্র তাকে বিশ্বজুড়ে অমর করে তোলে। প্রায় আড়াই দশক ধরে এই চরিত্রেই তিনি দর্শকের হৃদয় জয় করেন।
চ্যাপলিন খুব দ্রুতই আর্থিকভাবে সফল হয়ে ওঠেন। বিভিন্ন স্টুডিওর সঙ্গে চুক্তি করে তিনি অল্প সময়েই কোটিপতি হয়ে যান এবং ১৯১৯ সালে নিজস্ব চলচ্চিত্র স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন, যা তাকে শিল্পী হিসেবে আরও স্বাধীনতা দেয়।
নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগ শেষ হয়ে শব্দযুক্ত সিনেমা শুরু হলেও চ্যাপলিন প্রথমে তা গ্রহণ করতে চাননি। তিনি মনে করতেন, এতে তার চরিত্রের আবেগ ও প্রকাশভঙ্গি হারিয়ে যাবে। পরে ১৯৪০ সালে ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ সিনেমায় তিনি প্রথমবার পূর্ণ সংলাপ ব্যবহার করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একাধিকবার বিয়ে করেন। বিশেষ করে তরুণ অভিনেত্রীদের সঙ্গে তার বিয়েগুলো তখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। শেষ পর্যন্ত তিনি উনা ও’নিলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী দাম্পত্য জীবনে আবদ্ধ হন এবং তাদের আট সন্তান জন্ম নেয়।
রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে একসময় যুক্তরাষ্ট্রে তার জীবন কঠিন হয়ে ওঠে। কমিউনিস্ট সহানুভূতির অভিযোগে তাকে দেশটি ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এরপর তিনি সুইজারল্যান্ডে বসবাস শুরু করেন এবং বহু বছর পর ১৯৭২ সালে সম্মানসূচক পুরস্কার নিতে আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফেরেন।
তার মৃত্যুর পরও ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা। সুইজারল্যান্ডে কবর থেকে তার মরদেহ চুরি করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরে পুলিশ চোরদের গ্রেপ্তার করে এবং মরদেহ উদ্ধার করে পুনরায় দাফন সম্পন্ন করে।
চার্লি চ্যাপলিনের জীবন ছিল একদিকে সংগ্রাম, অন্যদিকে সাফল্যের উজ্জ্বল অধ্যায়। দুঃখ, প্রতিভা আর মানবতার মিশেলে গড়া এই জীবন আজও তাকে বিশ্বের সবচেয়ে স্মরণীয় শিল্পীদের একজন করে রেখেছে।