
শেয়ারবাজারের ব্লক মার্কেটে লেনদেন এবং ‘কাউন্টারপার্টি ট্রেডিং’-এর মাধ্যমে সিটি ব্যাংক পিএলসির পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের তহবিল থেকে ব্যক্তিগতভাবে অন্যায্য সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির তিন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও সাবেক এক পোর্টফোলিও ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্ট আরও একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তদন্তে এসব লেনদেনে অনিয়ম ও কারসাজির তথ্য উঠে এসেছে। এ ঘটনায় সিটি ব্যাংক, ব্যাংকটির তৎকালীন ফান্ড ম্যানেজার এবং সংশ্লিষ্ট পাঁচ ব্যক্তির বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। তবে বিএসসি’র জরিমানা ও তিন ডিএমডির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় উঠেছে নানা প্রশ্ন।
বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের তহবিল ব্যবহার করে কয়েকজন কর্মকর্তা কম দামে শেয়ার কিনে বেশি দামে ব্যাংকের তহবিলের কাছেই বিক্রি করেছেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে ব্যাংকের তহবিলে শেয়ার বিক্রি করে ব্যক্তিগত মুনাফা নিয়েছেন। এতে ব্যাংকের বিনিয়োগ তহবিলের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তে সংশ্লিষ্ট হিসেবে উঠে এসেছে সিটি ব্যাংকের সাবেক ক্যাপিটাল মার্কেট পোর্টফোলিও ম্যানেজার মো. সানোয়ার খান এবং ব্যাংকটির তিন ডিএমডি -এ কে এম সাইফ উল্লাহ কাওছার, মোহাম্মদ মাহমুদ গনি ও মো. আশানুর রহমানের নাম। এ ছাড়া আরও একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য রয়েছে বিএসইসির তদন্ত ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রমে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) সংশ্লিষ্টতা এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্তির কারণে সিটি ব্যাংক দেশের বেসরকারি ব্যাংক খাতে একটি পরিচিত নাম। গত জুনে ব্যাংকটি ‘ফাইন্যান্স এশিয়া অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’-এ স্বীকৃতি পেয়েছে। একই আয়োজনে ব্যাংকটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল ও সিটি ব্রোকারেজও স্বীকৃতি পায়। গত নভেম্বরে ‘বাংলাদেশ সি-সুইট অ্যাওয়ার্ডস’-এর চতুর্থ আসরে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন ‘সিইও অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার অর্জন করেন।
তবে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ কার্যক্রমে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ এসব অর্জনের পাশাপাশি ব্যাংকের সুশাসন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সানোয়ার খানের লেনদেন ঘিরে তদন্ত
বিএসইসির তদন্তের সূত্রপাত হয় সিটি ব্যাংকের তৎকালীন ক্যাপিটাল মার্কেট পোর্টফোলিও ম্যানেজার মো. সানোয়ার খানকে কেন্দ্র করে। তদন্তে দেখা যায়, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তিনি নিজের এবং স্ত্রী আসমাউল হুসনার বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাব ব্যবহার করে ব্যাংকের বিনিয়োগ তহবিলের সঙ্গে কাউন্টারপার্টি ট্রেডিংয়ে জড়িত ছিলেন।
অর্থাৎ, ব্যাংকের পক্ষে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় একই লেনদেনে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারী হিসেবেও অংশ নেন তিনি। বিএসইসির পর্যবেক্ষণে এ ধরনের লেনদেনকে স্বার্থের সংঘাত ও বিনিয়োগ কার্যক্রমের নৈতিকতা পরিপন্থী হিসেবে দেখা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে অগ্নি সিস্টেমস, ক্যাপিটেক জিবিএফ ইউনিট ও বিডি পেইন্টসের শেয়ার লেনদেনে অনিয়মের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকের তহবিল ব্যবহার করে ৩০ টাকা দরে শেয়ার কেনার পর একই শেয়ার ৪১ টাকা ২০ পয়সা দরে ব্যাংকের কাছেই বিক্রি করে সানোয়ার খান ও তাঁর স্ত্রী ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন করেন। এসব লেনদেনে ব্যাংকের তহবিলের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। গত জানুয়ারিতে অগ্নি সিস্টেমসের শেয়ার লেনদেনসংক্রান্ত ঘটনায় সানোয়ার খান, তাঁর স্ত্রী ও ভাইকে জরিমানা করে বিএসইসি। একই ঘটনায় সিটি ব্যাংককেও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
বিনিয়োগ নীতিমালা নিয়ে ব্যাংকের বক্তব্যে অসংগতি
বিএসইসির অনুসন্ধানের জবাবে গত বছরের ১০ জুলাই সিটি ব্যাংক প্রথমে দাবি করেছিল, সানোয়ার খানের লেনদেনগুলো ব্যাংকের তৎকালীন বিনিয়োগ নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তবে ব্লক মার্কেট লেনদেনের অনুমোদন ও অভ্যন্তরীণ নীতিমালা সম্পর্কে কমিশনের প্রশ্নের পর ব্যাংক ভিন্ন তথ্য দেয়।
পরবর্তীতে ব্যাংক জানায়, সংশ্লিষ্ট লেনদেনের সময় ব্লক মার্কেটে লেনদেনের বিষয়ে বিনিয়োগ নীতিমালা বা অভ্যন্তরীণ নীতিমালায় সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান ছিল না। ফলে অন্য কোনো পদ্ধতি বা বিদ্যমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
ব্যাংকের এই বক্তব্য ব্লক মার্কেটে বিনিয়োগ কার্যক্রমের অনুমোদন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত লেনদেন তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তিন ডিএমডির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ
বিএসইসির তদন্তে সানোয়ার খানের পাশাপাশি সিটি ব্যাংকের তিন ডিএমডির বিরুদ্ধে ব্লক মার্কেটে ব্যাংকের তহবিল ব্যবহার করে অন্যায্য সুবিধা নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিএমডি এ কে এম সাইফ উল্লাহ কাওছার বিভিন্ন শেয়ারের লেনদেনে ব্যাংকের বিনিয়োগ তহবিলকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন করেন।
২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর তিনি সিটি ব্যাংকের তহবিলের কাছে ব্লক মার্কেটে ২৫ হাজার লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার ৯৭ টাকা দরে বিক্রি করেন। ওই সময় শেয়ারটির বাজারদর ছিল ৯২ টাকা ২০ পয়সা। এ লেনদেনে তাঁর অন্যায্য মুনাফার পরিমাণ ছিল এক লাখ ২০ হাজার টাকা।
একইভাবে ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি তিনি মিডল্যান্ড ব্যাংকের সাড়ে তিন লাখ শেয়ার সিটি ব্যাংকের তহবিলের কাছে প্রতিটি ২৯ টাকা ৮০ পয়সা দরে বিক্রি করেন। ওই সময় শেয়ারটির বাজারদর ছিল ২৭ টাকা ৬০ পয়সা। এ লেনদেনে তিনি সাত লাখ ৭০ হাজার টাকা মুনাফা করেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ২৪ মে পর্যন্ত ১১টি লেনদেনের মাধ্যমে মিডল্যান্ড ব্যাংক, ফাইন ফুডস ও ওরিয়ন ইনফিউশনসের শেয়ার কেনাবেচা করে এ কে এম সাইফ উল্লাহ কাওছারের অন্যায্য মুনাফার পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৮৫ হাজার ৪০৫ টাকা।
অন্যদিকে, ডিএমডি মোহাম্মদ মাহমুদ গনি মিডল্যান্ড ব্যাংক ও ফাইন ফুডসের শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে পাঁচ লাখ ৭১ হাজার টাকা মুনাফা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
ডিএমডি মো. আশানুর রহমান সিটি ব্যাংকের বিনিয়োগ তহবিল ব্যবহার করে মিডল্যান্ড ব্যাংক, সানলাইফ ও ওরিয়ন ইনফিউশনসের শেয়ার কেনাবেচার মাধ্যমে চার লাখ ৩৫ হাজার টাকা অন্যায্য সুবিধা নেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
জরিমানা হলেও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন
বিএসইসির এনফোর্সমেন্ট অ্যাকশন রিপোর্ট অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে অনিয়ম ও কারসাজির ঘটনায় সিটি ব্যাংককে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই ঘটনায় ব্যাংকটির সাবেক পোর্টফোলিও ম্যানেজার সানোয়ার খানকে এক কোটি ৫১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তদন্তে তাঁর ক্যাপিটাল গেইন বা মুনাফার পরিমাণ এক কোটি ৫৩ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। সানোয়ার খানের স্ত্রী আসমাউল হুসনা ১৫ লাখ টাকা মুনাফা করলেও তাঁকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তাঁর ভাই আনোয়ার পারভেজ খান দুই লাখ ৪৬ হাজার ২২৮ টাকা মুনাফার বিপরীতে দুই লাখ টাকা জরিমানার মুখে পড়েন।
এ ছাড়া, আবু তাহের শিকদারকে ৬৫ লাখ ৪৬ হাজার টাকা মুনাফার বিপরীতে ৬২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। উম্মে সালমা নিপাকে দুই লাখ টাকা এবং বিপ্লব শেখকে চার লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখিত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জরিমানার অঙ্ক, পৃথক তদন্তের বিষয় এবং সামগ্রিক এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রমের অঙ্কের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে মোট জরিমানার পরিমাণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ হিসাব বিএসইসির আদেশ থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
সানোয়ার খানকে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হলেও অন্য অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সিটি ব্যাংক কী ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যাংকের তহবিল ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তদন্তে উঠে আসার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এবিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসাইন খান ঢাকাওয়াচ কে বলেন, যেহেতু বিএসইসি থেকে একটা নির্দেশনা আসছে সেটা সিটি ব্যাংক পরিপালন করা উচিত। তবে রেগুলেটর বডি হিসেবে কোনো রকম অনিয়ম বাংলাদেশ ব্যাংক সাপোর্ট করে না।
এ বিষয়ে সিটি ব্যাংকের সাবেক ক্যাপিটাল মার্কেট পোর্টফোলিও ম্যানেজার মো. সানোয়ার খানের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন ঢাকাওয়াচকে বলেন, “বিষয়টি আমাকে খতিয়ে দেখতে হবে।”
জরিমানার বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম ঢাকাওয়াচকে বলেন, সিটি ব্যাংক রিভিউ আবেদন করেছে সে রিভিও আবেদন নিষ্পত্তি প্রক্রিয়াদিন রয়েছে।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা রক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত ও জরিমানা গুরুত্বপূর্ণ হলেও ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং জরিমানার অর্থ আদায় নিশ্চিত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ