
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির প্রশাসক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে হেনস্তা, গালিগালাজ এবং প্রশাসনিক কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির একদল কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে। এক কর্মকর্তার বদলির প্রতিবাদে প্রশাসকের চেম্বারে গিয়ে তারা অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর এ ঘটনা ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, ইসলামী ব্যাংকের লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (ইভিপি) খালেদ সাইফুল্লাহকে ইনভেস্টমেন্ট বিভাগে বদলি করা হয়।
এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ব্যাংকটির প্রায় ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রশাসক জহির হোসেনের চেম্বারে যান। এ সময় তারা তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী ও প্রটোকল কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিয়ে জোরপূর্বক চেম্বারে প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে বদলির কারণ জানতে চেয়ে প্রশাসকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও গালিগালাজ করা হয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সূত্রের দাবি, খালেদ সাইফুল্লাহকে শুধু জামায়াতের নেতা হওয়ার কারণে বদলি করা যাবে না—এমন বক্তব্য তুলে ধরে প্রশাসকের ওপর বদলির আদেশ বাতিলের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। তবে এ বক্তব্যের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক পরিচয়ের সঙ্গে বদলির বিরোধের সম্পর্ক স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া আতাউর রহমান নামে এক কর্মকর্তাকে লিগ্যাল ডিভিশনে পদায়নের আদেশ দেওয়ার পর চাপ প্রয়োগ করে তাঁকে ব্যাংক থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি ঘিরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ব্যাংকের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এ ধরনের বিরোধ দেখা দিলে দায়িত্ব পালন, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ঢাকাওয়াচ কে বলেন, কোনো ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি রুটিন কাজের অংশ। প্রশাসনিক প্রয়োজনে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যেকোনো কর্মকর্তাকে বদলি বা পদায়ন করতে পারে।
তাঁর ভাষ্য, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী দলবদ্ধ হয়ে কাজে বাধা দেওয়া এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে গালিগালাজ বা অপমান করলে তা চাকরিবিধির পরিপন্থী। এ ধরনের ঘটনা ব্যাংকের শৃঙ্খলার জন্য অশনিসংকেত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, গভর্নরের পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক জহির হোসেনকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া এবং তাঁর সঙ্গে মারমুখী আচরণের অভিযোগ শুনে তাঁরা হতভম্ব। এভাবে পরিস্থিতি চলতে থাকলে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা কোথায়—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসক ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জহির হোসেন ঢাকাওয়াচকে বলেন, “বিস্তারিত জানতে ইসলামী ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা প্রত্যক্ষদর্শী, তাঁদের কাছে জিজ্ঞেস করলেই আসল ঘটনা জানতে পারবেন। তাঁরা আমাকে এস আলমের লোক বলে দাবি করেন। প্রকৃতপক্ষে আমি এস আলমের লোক নই। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আমি শুধু সেই দায়িত্ব পালন করছি।”
অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলতাফ হোসেন বলেন, তিনি এ ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এ ধরনের কোনো পরিস্থিতির বিষয়ে তিনি অবগত নন বলেও জানান।
সংস্কার কার্যক্রমে অভ্যন্তরীণ বিরোধের প্রভাব কতটা
ইসলামী ব্যাংকের অতীতের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট বিরোধ এবং সংস্কার কার্যক্রম ঘিরে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিরোধের অভিযোগ ওঠায় ব্যাংকটির সংস্কার কার্যক্রম, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের মতে, বদলি বা পদায়ন নিয়ে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর আপত্তি থাকলে তা নিয়মতান্ত্রিকভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো উচিত। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া কিংবা চাপ প্রয়োগের বিষয়গুলো প্রযোজ্য চাকরিবিধি অনুযায়ী বিবেচনা করা যেতে পারে।
এদিকে সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসক মোহাম্মদ জহির হোসেনের পদত্যাগ দাবি করেছে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। ফলে প্রশাসকের দায়িত্ব পালন, ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রম এবং অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধ—সব মিলিয়ে ব্যাংকটির পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।