
‘এক দেশ, এক কিউআর’ ব্যবস্থা চালুর পর দেশে অভিন্ন বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে বাংলা কিউআরে। ফলে সাপ্তাহিক লেনদেনের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ৭০০ কোটি টাকা।
লেনদেনের সংখ্যা ও আর্থিক মূল্য—দুই সূচকেই বাংলা কিউআরের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুলাইয়ের শুরুতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার লেনদেন হলেও আগস্টের মাঝামাঝি তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ ৩ হাজারে। একই সময়ে দৈনিক লেনদেনের আর্থিক পরিমাণ প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পায়।
চলতি বছরের ১ জুলাই দেশে বাধ্যতামূলকভাবে ‘এক দেশ, এক কিউআর’ ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পরপরই সারাদেশে বাংলা কিউআরের কার্যক্রম শুরু হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগের ফলে বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান নিজেদের পৃথক কিউআর কোডের পরিবর্তে বাংলা কিউআরের আওতায় এসেছে। এতে বড় শপিংমল থেকে শুরু করে ছোট দোকান ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীরাও একই কিউআর কোড ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শুরুতে বাংলা কিউআরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার লেনদেন হতো। এসব লেনদেনের মোট আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৩৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে দৈনিক গড় লেনদেনের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৩ হাজারে পৌঁছায়। একই সময়ে দৈনিক গড় লেনদেনের আর্থিক পরিমাণও বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১১০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
শুধু লেনদেন নয়, বাংলা কিউআর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। ২১ জুলাই পর্যন্ত এ ব্যবস্থা ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ থাকলেও তা বেড়ে ৩০ লাখের বেশি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বাসসকে বলেন, বর্তমানে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। সপ্তাহে লেনদেনের পরিমাণ ৭০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, লেনদেনের এই গতি অব্যাহত থাকুক।’
বাংলা কিউআরের ব্যবহার আরও বাড়াতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ দূর করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আরিফ হোসেন খান জানান, ব্যবসায়ীদের মধ্যে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর নিয়ে কিছুটা দ্বিধা রয়েছে।
তিনি বলেন, কোনো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ১০০ টাকার পণ্য বিক্রি করে যদি ৯৯ টাকা পান, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তার মনে প্রশ্ন আসতে পারে—কেন তিনি এক টাকা কম নেবেন? তবে ডিজিটাল ও নগদবিহীন লেনদেন বাড়লে পণ্য বিক্রির পরিমাণও বাড়তে পারে।
তার মতে, নগদবিহীন লেনদেন সহজ হলে ক্রেতারা আরও বেশি কেনাকাটায় উৎসাহিত হতে পারেন। ব্যবসায়ীদের জন্য ভর্তুকি দেওয়ার বিষয়েও বাংলাদেশ ব্যাংক চিন্তাভাবনা করছে। এ বিষয়ে ঘোষণার পর লেনদেনের গতি আরও বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
একটি কিউআর কোডের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএস হিসাব থেকে অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হওয়ায় গ্রাহকদের ভোগান্তিও কমেছে।
রাজধানীর নিউমার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা আজিমপুরের বাসিন্দা তুহিন ইসলাম বাসসকে বলেন, আগে নগদ, বিকাশ কিংবা রকেটের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করতে হলে দোকানে কোন সেবার কিউআর কোড রয়েছে, তা দেখতে হতো।
তিনি বলেন, ‘আমি বিকাশ ব্যবহার করি না। ফলে, অনেক দোকানে গিয়ে টাকা দিতে সমস্যায় পড়েছি। কারণ, ওই দোকানগুলোতে বিকাশ ছাড়া অন্য কোনো কিউআর ছিল না।’
এখন একটি কিউআর কোড স্ক্যান করেই নিজের যেকোনো হিসাব থেকে টাকা পরিশোধ করা যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
‘ফলে বড় ধরনের ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়েছি,’ বলেন তুহিন ইসলাম।
ঢাকায় পাইকারি কাপড় কিনতে আসা মাহিন হোসেন বলেন, গ্রাম থেকে রাজধানীতে পাইকারি পণ্য কিনতে এলে সঙ্গে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা বহন করতে হয়, যা ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘এখন একটি কিউআর কোড স্ক্যান করে সহজেই অনলাইনে টাকা দিতে পারছি। ফলে, সঙ্গে করে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে না।’
ডিজিটাল লেনদেন সহজ করার পাশাপাশি নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি কমানো এবং ব্যবসায়ী ও গ্রাহক—উভয়ের জন্য অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করাই বাংলা কিউআর ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য। সাম্প্রতিক লেনদেনের প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে, অভিন্ন এই কিউআর ব্যবস্থা ধীরে ধীরে দেশের দৈনন্দিন কেনাবেচার গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যমে পরিণত হচ্ছে।