
বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিল ১৫ বছরের জান্নাতুল তাজমিন। কয়েক দিন পর কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে তার মৃত্যু হয়। বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগৎপুর মাইনি মুড়া এলাকার একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন তার বাবা আবদুল আলীম।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্সের ধানমন্ডি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বের হয় তাজমিন। পরে বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায় সে। বুধবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয়।
তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম জানান, বুধবার রাতে মেয়েকে একাধিকবার ফোন করলেও কথা হয়নি। রাত পৌনে ২টার দিকে মেয়ে মোবাইল ফোনে বার্তা ও লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যেতে বলে। তখন ঘুমিয়ে থাকায় তিনি বার্তাটি দেখতে পারেননি। সকালে বার্তা দেখে লোকেশন অনুযায়ী সেখানে গিয়ে মেয়ের মরদেহ দেখতে পান।
নিহত তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের আবদুল আলীমের মেয়ে। সে কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা অঞ্চলে চাকরি করেন।
সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেছে
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে নামতে দেখা যায় তাজমিনকে। বাসটি কক্সবাজার থেকে ফিরছিল।
ফুটেজে দেখা যায়, বাস থেকে নেমে সে হোটেলের পাশের খাবারের দোকান ও পশ্চিম পাশের কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যায়। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সঙ্গে কথা বলতেও দেখা যায় তাকে। পরে রাত ১২টার দিকে সেখান থেকে সরে যায় এবং সোয়া ১২টার দিকে এলাকাটি ছেড়ে চলে যায়। এরপর সে কোন পথে গিয়েছিল, তা এখনো সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্ত করা যায়নি।
বাস থেকে নামার পর তাজমিন কোথায় গিয়েছিল, কারও সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না এবং মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে কিছুটা দূরে পাওয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
ধানখেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন, পাশে অটোরিকশা
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে ধানখেতে প্রথমে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা দেখতে পান তাঁরা। পরে কাছাকাছি একটি ভ্যানিটি ব্যাগ এবং ধানখেতে মরদেহ দেখতে পান। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, অটোরিকশা থেকে ২০ থেকে ৩০ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ পড়ে ছিল। আশপাশের ধানখেতে ধস্তাধস্তির চিহ্নও দেখা যায়। পরে তিনি মরদেহ দেখতে পেয়ে জরুরি সেবায় ফোন করেন।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, ধানখেতে ধস্তাধস্তির আলামত দেখা গেছে। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
ঘটনাস্থলে অন্তত চার থেকে পাঁচটি ধানখেতে ধানগাছ এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যায়। সড়কের পাশে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাও ছিল। পরে স্থানীয়রা সেটি টেনে সড়কে তোলেন।
যা বলছে পুলিশ
পুলিশ জানিয়েছে, বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাজমিন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল। সে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে কুমিল্লায় এসে পরে কক্সবাজারে যায়। বুধবার দুপুরের পর কক্সবাজার থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয়। তবে যাত্রাপথে তার সঙ্গে কেউ ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, তাজমিনের মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি। প্রথমে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলেও পরে তা নিশ্চিত করা হয়। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি নিবন্ধিত। সেটির সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।