
জন্ম থেকেই দুই হাত নেই। কিন্তু সেই শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জীবনের পথে বাধা হতে দেননি নরসিংদীর আলতাফ হোসেন, স্থানীয়ভাবে যিনি ‘দুঃখু মিয়া’ নামে পরিচিত। পা দিয়ে লেখার অভ্যাস রপ্ত করে পড়াশোনা শেষ করেছেন, চাকরির জন্য বহু প্রতিষ্ঠানের দরজায় ঘুরেছেন। বারবার ব্যর্থ হওয়ার পরও থেমে যাননি। নিজের পৈতৃক জমিতে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে এখন ১৪৫ শিশুর শিক্ষক তিনি।
নরসিংদী সদর উপজেলার নগর পাঁচদোনা এলাকায় ১৯৬২ সালে জন্ম আলতাফ হোসেনের। তার বাবা মৃত তমিজ উদ্দিন। জন্মের পর দুই হাত না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন ছিলেন তার মা-বাবা। এর মধ্যে জন্মের পর তার তিন ভাই মারা যায়। দাদা আদর ও আক্ষেপ মিশিয়ে নাতির নাম রাখেন ‘দুঃখু মিয়া’। সেই নামের সঙ্গে দুঃখের স্মৃতি জড়িয়ে থাকলেও জীবনযুদ্ধে কখনো নিজেকে পরাজিত হতে দেননি তিনি।
কলাপাতায় পা দিয়ে লেখার শুরু, সেখান থেকেই শিক্ষাজীবনের পথচলা
পাঁচদোনা ইউনিয়নের দিঘিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু হয় দুঃখু মিয়ার পড়াশোনা। দুই হাত না থাকায় ছোটবেলাতেই পা দিয়ে লেখার কৌশল আয়ত্ত করেন তিনি।
কীভাবে এই অসম্ভব মনে হওয়া কাজটি শিখলেন—সেই গল্পও কম সংগ্রামের নয়। দুঃখু মিয়া জানান, তার বাবা তাকে পা দিয়ে লেখার প্রশিক্ষণ দেন। পাতিলের কালি ও পানি মিশিয়ে কঞ্চি কলাপাতার ওপর রাখা হতো। এরপর দুই পায়ের আঙুলের মাঝখানে সেটি ধরে ধীরে ধীরে লেখার অনুশীলন করানো হয়। সেই অনুশীলনই একসময় তাকে স্বাভাবিকভাবে পা দিয়ে লিখতে সক্ষম করে।
এরপর পা দিয়েই লিখে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি সম্পন্ন করেন তিনি। ১৯৮২ সালে মাধ্যমিক, ১৯৮৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯৮৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন আলতাফ হোসেন।
জীবনকে তিনি দেখেন নিরন্তর সংগ্রাম হিসেবে। দুঃখু মিয়ার ভাষায়, জীবন কারও জন্য অপেক্ষা করে না। তাই লড়াই করেই নিজের জীবন এগিয়ে নিতে হয়। আর সেই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো কারও কাছে হাত না পেতে নিজের সামর্থ্যে এগিয়ে যাওয়া।
চাকরি না পেয়ে নিজের জমিতেই গড়লেন বিদ্যালয়
শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর শুরু হয় নতুন সংগ্রাম—কর্মসংস্থানের চেষ্টা। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করেন তিনি। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও বারবার ভাইভায় গিয়ে বাদ পড়েছেন। চাকরির আশায় মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছেও গেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো চাকরি জোটেনি।
দুঃখু মিয়া বলেন, অনেক জায়গায় আবেদন করার পর লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও মৌখিক পরীক্ষায় সফল হতে পারেননি। চাকরির আশায় বিভিন্ন মন্ত্রী ও কর্মকর্তার দ্বারস্থ হয়েও কোনো ফল পাননি।
একসময় হতাশা এলেও বসে থাকেননি তিনি। টিউশনি ও কোচিং করানো শুরু করেন। সেখান থেকে পাওয়া অর্থ জমাতে থাকেন। পরে বাবার কাছ থেকে পাওয়া জমিও বিক্রি করেন। সেই অর্থে ২০০৭ সালে নিজের পৈতৃক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুঃখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’।
বিদ্যালয়টিতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। বর্তমানে ১০ জন শিক্ষক ১৪৫ শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছেন। আছেন আরও দুজন কর্মচারী। প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিনা মূল্যে পড়াশোনার ব্যবস্থাও রেখেছেন তিনি।
বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, টিনশেড ভবনের একটি শ্রেণিকক্ষে পা দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছেন দুঃখু মিয়া। কখনো গল্পের মাধ্যমে, কখনো হাসিমুখে শিশুদের কঠিন বিষয়ও সহজ করে বোঝাচ্ছেন। দুই হাত না থাকার বিষয়টি তার শিক্ষকতার পথে যেন কোনো প্রতিবন্ধকতাই তৈরি করতে পারেনি।
যে বঞ্চনা তাকে থামায়নি, বরং স্কুল গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে
দুঃখু মিয়ার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতিগুলোর একটি তার শৈশবের। ছোটবেলায় বাবা তাকে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু দুই হাত না থাকায় পা দিয়ে ধর্মীয় গ্রন্থ পড়তে হবে—এই কারণ দেখিয়ে তাকে সেখানে ভর্তি করা হয়নি।
শিক্ষা পাওয়ার সেই বঞ্চনার স্মৃতিই পরবর্তী সময়ে তার জীবনের অন্যতম প্রেরণা হয়ে ওঠে। যে সমাজ একসময় তাকে শিক্ষার সুযোগ দিতে চায়নি, সেই সমাজের শিশুদের জন্যই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
দুঃখু মিয়ার লক্ষ্য, এলাকার শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া। তার আরও ইচ্ছা—কোনো প্রতিবন্ধী শিশু যেন শিক্ষার জন্য গিয়ে নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে তার মতো অপমান বা বঞ্চনার শিকার না হয়।
তবে বিদ্যালয় চালাতে গিয়ে এখনো নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। অনেক সময় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রত্যাশিত সম্মানিও দিতে পারেন না। তারপরও সহানুভূতিশীল শিক্ষকরা তার পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে বিদ্যালয়টিকে একটি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে রূপ দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটি আরও বড় পরিসরে গড়ে তুলে একদিন এর দায়িত্ব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেওয়ার ইচ্ছাও রয়েছে তার।
দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয় পরিচালনা করলেও সরকারি সহায়তা না পাওয়ার আক্ষেপও আছে দুঃখু মিয়ার। তিনি জানান, এত বছর ধরে কাজ করার পরও সরকার থেকে কোনো সহযোগিতা পাননি; এমনকি বিদ্যালয়ের জন্যও কোনো সরকারি সহায়তা মেলেনি।
তার এই পথচলায় এখন পাশে রয়েছেন ছেলে মোহাইমিনুল ইসলাম। বাবার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়েই সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তার ভাষায়, অসংখ্য প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বাবা সমাজে শিক্ষার বিস্তারে কাজ করে যাচ্ছেন—এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা করিম বলেন, দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও দুঃখু মিয়া নিজের সীমাবদ্ধতাকে জয় করে শিশুদের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। তার এই কাজকে এগিয়ে নিতে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী কাওছারের চোখেও দুঃখু মিয়া আলাদা এক অনুপ্রেরণা। তার ভাষায়, স্যার পা দিয়ে লেখেন, অথচ অনেকের হাতের লেখার চেয়েও তা সুন্দর। তিনি খুব যত্ন নিয়ে পড়ান এবং তার জীবনসংগ্রাম শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে।
সহকারী শিক্ষক আসমা বেগমও তাকে সাহসের প্রতীক হিসেবে দেখেন। তার মতে, দুঃখু মিয়ার জীবন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।
একসময় শিক্ষা ও চাকরির সুযোগের জন্য যে সমাজের দরজায় বারবার ঘুরেছেন আলতাফ হোসেন, আজ সেই সমাজের শিশুদেরই জ্ঞান দিচ্ছেন তিনি। দুই হাত না থাকলেও থেমে যায়নি তার পথচলা। পা দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা প্রতিটি অক্ষর যেন তার দীর্ঘ সংগ্রামের সাক্ষ্য; আর বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী সেই সংগ্রাম থেকে অর্জিত একেকটি সাফল্যের প্রতিচ্ছবি।
সূত্র: যুগান্তর