.jpg)
চাঁদপুরের আট উপজেলার ৯২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাগজে-কলমে চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে এসব কেন্দ্রে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা মিলছে না। এসব কেন্দ্রে নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকদের সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংযুক্তিতে দায়িত্ব দেওয়ায় প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে সাধারণ চিকিৎসার জন্যও ছুটতে হচ্ছে উপজেলা বা জেলা সদরে।
শুধু চিকিৎসক নয়, ইউনিয়ন পর্যায়ের এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদেও রয়েছে বড় ধরনের জনবলসংকট। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহও অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয়। ফলে স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা কেন্দ্রগুলোতেই কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা।
৯২ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোনোটিতেই নেই নিয়মিত চিকিৎসক
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরের আট উপজেলায় ইউনিয়ন পর্যায়ে মোট ৯২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৭২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে সাধারণ রোগের চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, পরিবার-পরিকল্পনা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়াই এসব প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। এ কারণে প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য কাগজে-কলমে একজন করে এমবিবিএস চিকিৎসক বরাদ্দ রয়েছে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। এসব কেন্দ্রে নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকদের প্রেষণ বা সংযুক্তির মাধ্যমে উপজেলা কিংবা জেলা সদরের বিভিন্ন হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে ইউনিয়ন পর্যায়ে তাঁদের নিয়মিত উপস্থিতি থাকছে না।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রত্যন্ত এলাকার রোগীদের ওপর। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক না থাকায় সামান্য চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনেও তাঁদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা জেলা সদরের হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
উপসহকারী মেডিকেল অফিসারের ৫৩ পদের ৩৯টিই শূন্য
চিকিৎসকের পাশাপাশি অন্যান্য জনবলের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
চাঁদপুরের ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের মোট পদ রয়েছে ৫৩টি। এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১৪ জন। অর্থাৎ এই পদে শূন্য রয়েছে ৩৯টি।
পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকার ১৪২টি পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ৫৯ জন। শূন্য পদ রয়েছে ৮৩টি।
অন্যদিকে, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকের মোট ৯১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৮২ জন। এই পদে শূন্য রয়েছে ৯টি।
পরিবারকল্যাণ সহকারীর ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ঘাটতি। মোট ৫১৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩৩৭ জন। ফলে এই পদে শূন্য রয়েছে ১৭৬টি।
সাধারণ ওষুধও অনেক সময় মিলছে না
জনবলসংকটের পাশাপাশি ওষুধের ঘাটতিও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে আসা রোগীদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।
সরকারি এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে দরিদ্র মানুষের বিনা মূল্যে অথবা স্বল্পমূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়ার কথা। কিন্তু পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় অনেক সময় রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।
এতে বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। কারণ প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার সামর্থ্য না থাকায় অনেকে চিকিৎসা নিয়েও ওষুধ সংগ্রহ করতে পারছেন না।
চিকিৎসক না থাকায় যেতে হচ্ছে জেলা সদর
সদরের বাগাদী ইউনিয়নের সোবহানপুর গ্রামের সুমাইয়া আক্তার জানান, তাঁদের এলাকায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও সেখানে কোনো এমবিবিএস চিকিৎসক নেই। ফলে চিকিৎসার জন্য তাঁকে জেলা সদরে যেতে হয়।
দেড় বছরের সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে সদর হাসপাতালে যাতায়াত করা তাঁর জন্য কষ্টকর বলেও জানান তিনি।
সম্প্রতি ওই ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে রোগীর উপস্থিতি খুবই কম দেখা যায়। সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী জানান, সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশির মতো পরিচিত রোগের ওষুধও অনেক সময় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাওয়া যায় না।
ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ না পেয়েই অনেককে ফিরে যেতে হয়। বাইরে থেকে ওষুধ কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্যও অনেক রোগীর নেই।
বালিয়ার স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও একই চিত্র
বালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের পাশে থাকা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রটির পরিস্থিতিও ভিন্ন নয়।
স্থানীয় শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেনের ভাষায়, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির অবস্থা অনেকটা ভুতুড়ে। সেখানে চিকিৎসক নেই, এমনকি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীও নেই।
একসময় এলাকার অধিকাংশ মানুষ এই কেন্দ্র থেকেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিতেন। কিন্তু বর্তমানে সেখানে শুধু একজন স্বাস্থ্য সহকারী বসেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চিকিৎসকই যদি না থাকেন, তাহলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকা আর না থাকার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। এর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আরও অনেক পদ শূন্য থাকায় কেন্দ্রগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
তাঁদের দাবি, দ্রুত শূন্য পদগুলোতে জনবল নিয়োগ দিতে হবে এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে কার্যকরভাবে চালু করতে হবে। এতে ইউনিয়ন পর্যায়ের মানুষ স্থানীয়ভাবেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
সংযুক্তিতে চিকিৎসক, তাই ইউনিয়নে সেবা ব্যাহত
চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নুর আলম দীন জানান, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র এবং উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর জন্য যেসব চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংযুক্তিতে রাখা হয়েছে।
এই কারণে ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকেরা তাঁদের নির্ধারিত কর্মস্থলে নিয়মিত সময় দিতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
ডা. মোহাম্মদ নুর আলম দীন আরও বলেন, সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হলে ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি হবে।
শূন্য পদ পূরণে চলছে নিয়োগপ্রক্রিয়া
চাঁদপুর পরিবার-পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক মো. মোস্তফা কামাল বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর জনবলসংকটের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে।
শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য সরকার ইতিমধ্যে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করেছে বলেও জানান তিনি। তাঁর আশা, নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ হলে জনবলসংকট অনেকটাই কমে আসবে।
দুই-তিন মাসে ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিকের আশা
স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ওষুধের ঘাটতির বিষয়েও কথা বলেছেন সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নুর আলম দীন।
তিনি বলেন, বর্তমানে কিছুটা ওষুধ সংকট রয়েছে। তবে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরবরাহ স্বাভাবিক হলে ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো থেকেই সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।