
তীব্র গ্যাসসংকটে নরসিংদীর ছোট-বড় শতাধিক শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কাজ না থাকায় এসব কারখানার শ্রমিকদের বসে থাকতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভোগান্তিতে পড়েছেন শিল্পমালিকেরা। বাসাবাড়িতেও চুলা জ্বলছে না। অন্যদিকে সিএনজি পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে।
শিল্পমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাসের চলমান সংকট শুরুর আগ থেকেই নরসিংদীতে গ্যাসের চাপ কম ছিল। তখন কম চাপের মধ্যেও পালা করে কোনোভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁরা। তবে এক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের চাপ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। কখনো কখনো চাপ শূন্যে নেমে এসেছে। গত এক মাস ধরে কম গ্যাসের চাপ ও বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করে অন্তত ১০ শতাংশ উৎপাদন চালু রাখা গেলেও কয়েক দিনে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কবে নাগাদ এই গ্যাসসংকটের সমাধান হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন শিল্পমালিকেরা।
নরসিংদী দেশের অন্যতম বর্ধনশীল শিল্পাঞ্চল। সারা দেশে স্থানীয় কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান দেয় এই জেলা। নরসিংদীতে টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং মিল মিলিয়ে কারখানার সংখ্যা তিন হাজারের বেশি।
কোন কোন কারখানার উৎপাদন বন্ধ
নরসিংদী শহর ও আশপাশের এলাকায় উৎপাদন বন্ধ থাকা কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে চিশতিয়া সাইজিং মিল, ইয়ামিন সাইজিং মিল, মমিন সাইজিং মিল, হোসেন ডাইং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিং মিল, আবেদ টেক্সটাইল মিলস, শিল্পী ডাইং, নদী-বাংলা সাইজিং মিল, ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস, আনোয়ার প্রিন্টেক্স, রংধনু সাইজিং মিল, এন আহমেদ ডাইং ও নাসির ডাইং।
এ ছাড়া মাধবদীর আমানত শাহ গ্রুপ ও পাকিজা গ্রুপের একাধিক কারখানা, এম এম কে ডাইং, মুক্তাদিন ডাইং, মাধবদী ডাইং, মুক্তা ডাইং ও সখিনা ডাইংসহ আরও বেশ কিছু কারখানা বন্ধ রয়েছে।
শিল্পমালিকেরা যা বলছেন
গ্যাসসংকট নিয়ে ১০ জন শিল্পমালিকের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। তাঁরা জানান, একের পর এক প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ধাক্কা সামলে ব্যবসায়ীরা যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই এই জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। জেলার ছোট-বড় শতাধিক শিল্পকারখানার উৎপাদন এখন পুরোপুরি বন্ধ। গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছেন শিল্পমালিকেরা। তাঁদের ধারণা, জ্বালানিসংকটের কারণে নরসিংদীতে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে শিল্পকারখানাগুলোতে ১৫ পিএসআই গ্যাস পাওয়ার কথা। এত দিন ধরে সেই চাপ কমে দুই, তিন বা চার পিএসআইয়ে নেমে এসেছিল। কয়েক দিন ধরে তা শূন্যের কাছাকাছি চলে গেছে।
নরসিংদী টেক্সটাইল, ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও মাধবদী ডাইং ফিনিশিং মিলসের মালিক নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, সারা দেশের ৭০ শতাংশ কাপড়ের চাহিদা মেটায় নরসিংদী। গ্যাসসংকটে জেলার অনেক মিল-কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে শিল্পমালিকেরা শ্রমিকদের বেতন কিংবা গ্যাস বিল—কোনোটিই দিতে পারবেন না।
নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি রাশিদুল হাসান জানান, ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যাওয়ায় নরসিংদীতে গ্যাসসংকট আরও তীব্র হয়েছে। গ্যাসনির্ভর এই সার কারখানাটি এত দিন ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছিল। এখন আমদানি কমিয়ে উৎপাদন বাড়াতে কারখানাটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো হচ্ছে। এর ফলে কলকারখানার জন্য নির্ধারিত গ্যাস সার কারখানায় চলে যাওয়ায় স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তারা গ্যাস পাচ্ছেন না।
গ্যাসসংকট দ্রুত সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস লিমিটেডের পরিচালক আনিসুর রহমান ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘সরকারের জানানো উচিত, এই সংকট কবে নাগাদ নিরসন হবে এবং ওই সময় পর্যন্ত আমাদের কী করা উচিত।’
নরসিংদীর আবেদ টেক্সটাইল মিলসের উৎপাদন ২০ দিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, উৎপাদন বন্ধ থাকায় কারখানায় শ্রমিকেরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ এড়াতে যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করানো হচ্ছে।
নরসিংদীতে তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক বিপণন কার্যালয়ের ম্যানেজার মাকসুদ রহমান জানান, ‘এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে নরসিংদীসহ আশপাশের কয়েকটি জেলায় গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এর ফলে উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানা, বাসাবাড়ি ও পরিবহন খাতে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। দ্রুত এই সংকট নিরসনের চেষ্টায় আছি আমরা।’