
দারিদ্র্য, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর জীবনের একের পর এক প্রতিকূলতা পেরিয়ে দর্শন বিভাগে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন মো. আনিছুর রহমান। চাকরির আশায় সরকারি-বেসরকারি প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০টি পদে আবেদন ও পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও জোটেনি একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ।
অসুস্থ বাবা, প্রয়াত মা ও প্রতিবন্ধী বেকার বোনকে নিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁর। তাই কোনো দয়া বা করুণা নয়, নিজের যোগ্যতা ও শ্রম দিয়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচার সুযোগ চান আনিছুর।
আগামী ১৬ আগস্ট কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি কর্মসূচিতে মাত্র এক মিনিটের জন্য সাক্ষাতের সুযোগ চেয়ে তাঁর আকুতি, "মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি ভিক্ষা চাই না, করুণা চাই না। শুধু এক মিনিট আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমাদের কষ্টের কথাগুলো আপনাকে বলতে চাই। একটি ছোটখাটো সম্মানজনক চাকরির সুযোগ পেলে আমরা দুই ভাই-বোন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব।"
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার চরপুমদী ইউনিয়নের শ্রীমন্তপুর গ্রামের আনিছুর রহমান ও তাঁর বোন আমেনা আক্তারের জীবনে স্বাভাবিকতা হারিয়ে যায় শৈশবেই। আনিছুরের বয়স তখন পাঁচ বছর, আর আমেনার সাত। মারাত্মক জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁরা দুজনই স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলার সক্ষমতা হারান।
তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁদের স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে বাবা ছিদ্দিক হোসাইন (আবু ছিদ্দিক) হাটে-বাজারে ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন। আর মা কখনো কোলে, কখনো কাঁধে করে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিতেন। অভাবের সংসারেও সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি তাঁরা।
নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ২০১৮ সালে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে দর্শন বিভাগে মাস্টার্স পাস করেন আনিছুর। এরপর শুরু হয় চাকরির জন্য দীর্ঘ লড়াই।
আবেদন ফি জোগাড় করতে পরিবারের শেষ সম্বলটুকুও ব্যয় করেছেন। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০টি চাকরির আবেদন ও পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। কিন্তু কোনো জায়গাতেই স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাননি।
এর মধ্যেই ২০২২ সালের ১৮ অক্টোবর স্ট্রোক করে মারা যান তাঁদের মা। ছেলে চাকরি করবে, মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুন্দর হবে এই স্বপ্ন নিয়েই পৃথিবী ছেড়ে যান তিনি।
আনিছুর বলেন, ‘আমার মা চাইতেন আমি চাকরি করে পরিবারের দায়িত্ব নেব। সেই আশায় তিনি কত মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। আজ মা নেই। কিন্তু মায়ের সেই অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করতে আমি সম্মানের সঙ্গে বাঁচার একটি সুযোগ চাই।’
আনিছুরের বাবা ছিদ্দিক হোসাইন হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। অসুস্থতার কারণে তিনিও এখন আর ঝালমুড়ি বিক্রি করতে পারেন না। ফলে পরিবারের একমাত্র উপার্জনের পথটিও বন্ধ হয়ে গেছে।
সামান্য কম্পিউটারের কাজ করে কোনোরকমে সংসার চলছে। আনিছুরের বোন আমেনা আক্তারও ডিগ্রি পাস করেছেন। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর পড়াশোনা ও কর্মজীবনও থমকে আছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তাঁর বিয়ের বিষয়েও নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে।
আনিছুর ও আমেনার চাওয়া খুব বেশি নয়। তাঁরা দান বা করুণা চান না। নিজেদের যোগ্যতা ও শ্রম দিয়ে পরিবারের বোঝা কমিয়ে আত্মনির্ভরশীল হতে চান।
কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, তাদের বিষয়টি আমি অবগত আছি। আনিছুর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মাত্র এক মিনিট দেখা করে তাঁর কথাগুলো বলতে চাচ্ছে। বিষয়টি আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। তাঁর এই আকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করব।
এদিকে আগামী ১৬ আগস্ট কটিয়াদীতে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি কর্মসূচিকে ঘিরে আনিছুরের মনে একটিই প্রত্যাশা যদি মাত্র এক মিনিটের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের গল্পটি বলতে পারেন। তাঁর বিশ্বাস, একটি মিনিটের সাক্ষাৎ হয়তো বদলে দিতে পারে দুই ভাই-বোনের পুরো জীবন।