
সরকার নির্ধারিত মৌলিক শিখনফল অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় পাবনার নয়টি উপজেলার ৩৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা অফিস। বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত দক্ষতা নিশ্চিত করতে না পারায় গত ২০ থেকে ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে এসব নোটিশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের তিন থেকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পাবনার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিইও) মো. আশরাফুল কবীর।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শোকজপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ের মধ্যে সাঁথিয়া উপজেলায় ৭৪টি, আটঘরিয়ায় ৫৯টি, পাবনা সদরে ৫৪টি, বেড়ায় ৫০টি, চাটমোহরে ৪৮টি, সুজানগরে ৪১টি, ঈশ্বরদীতে ২৩টি, ভাঙ্গুড়ায় ১১টি এবং ফরিদপুর উপজেলায় ৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় গত ৩০ জুনের মধ্যে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা রিডিং, চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের গণিতের চারটি মৌলিক নিয়ম—যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ—এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সাবলীল ইংরেজি রিডিং নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলো সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
এতে আরও বলা হয়েছে, একাধিক নির্দেশনা ও নিয়মিত তদারকির পরও কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এজন্য দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কেন বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তার লিখিত ব্যাখ্যা তিন কার্যদিবসের মধ্যে দিতে বলা হয়েছে। সন্তোষজনক জবাব না পেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
গত জুন মাসে জেলার ১ হাজার ১৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সেই পরিদর্শনে ৩৬৭টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিখন দক্ষতায় ঘাটতি ধরা পড়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের শোকজ করা হয়।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানিয়েছে, শোকজের আওতায় আসা বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শুধু চর ও দুর্গম এলাকার প্রতিষ্ঠান নয়, উপজেলা শহরের কয়েকটি পরিচিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও রয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট তুলনামূলক কম থাকলেও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত শিখনফল অর্জিত হয়নি।
এর মধ্যে ঈশ্বরদী পৌরসভার ফতেহ মোহাম্মদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬২৩ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১৬ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন, যা সরকারি জনবল কাঠামোর সঙ্গে প্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবুও গণিতে শিক্ষার্থীদের সফলতার হার ৫০ শতাংশের নিচে থাকায় বিদ্যালয়টিও শোকজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এদিকে শোকজের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন প্রধান শিক্ষক। তাদের ভাষ্য, শিক্ষক সংকট, শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতি, অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং চর ও দুর্গম এলাকার বাস্তবতা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার মান অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেড়া উপজেলার চর নতিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান মিয়া বলেন, “তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য বিদ্যালয়ে মাত্র তিনজন শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে স্থায়ী শিক্ষক দুজন। এ অবস্থায় নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত মূল্যায়ন করা কঠিন। পাশাপাশি চরাঞ্চলের অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে না পাঠিয়ে কৃষিকাজে যুক্ত করেন।”
একই উপজেলার নতুন মিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মকবুল হোসেন বলেন, “নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই মূল্যায়ন করায় প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয়নি। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।”
অন্যদিকে, কয়েকজন শিক্ষক বেড়া উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা কৃষ্ণ চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, তিনি নিজে বিদ্যালয়ে না গিয়ে নিজের পছন্দের প্রতিনিধির মাধ্যমে মূল্যায়ন করিয়েছেন। উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও সহকারী শিক্ষা অফিসারের পছন্দের কিছু বিদ্যালয়কে শোকজের আওতায় আনা হয়নি।
শিক্ষকদের আরও অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের শিখনফল অর্জনের সময়সীমা আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত থাকলেও তিন মাস আগেই শোকজ করা হয়েছে। এমনকি অনেক শিক্ষক নোটিশ হাতে পাওয়ার আগেই বিষয়টি প্রকাশ করা হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আশরাফুল কবীর বলেন, “প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। এফএলএন কর্মসূচি সফল করতে একাধিক সমন্বয় সভা করা হয়েছে। শিক্ষকদের লিখিত ব্যাখ্যা পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে পড়তে না পারলে সামনে শিক্ষকরা আরও বড় শাস্তির আওতায় আসতে পারে।”
তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে নয়টি উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও ব্যাখ্যা চেয়ে গত ২২ জুলাই ই-মেইলে চিঠি পাঠানো হয়েছে।