
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সরকারি বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে নতুন করে তীব্র যুদ্ধ শুরু হওয়ায় টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত দিয়ে আবারও বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ওপারে জান্তা বাহিনীর যুদ্ধবিমানের বোমাবর্ষণে এপারের সীমান্ত এলাকা কেঁপে উঠছে। তবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
দুই দিন ধরে বিমান হামলা, থরথর করে কাঁপল টেকনাফ
গত বুধ (১ জুলাই) ও বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা আরাকান আর্মির ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে দফায় দফায় বিমান হামলা চালায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। আকাশপথের এই ভয়াবহ আক্রমণের তীব্রতায় নাফ নদীর এপারে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের ঘরবাড়ি ও গ্রামগুলো ভূমিকম্পের মতো কেঁপে ওঠে। তবে আজ শুক্রবার মংডু শহরের অভ্যন্তরে সংঘর্ষ চললেও এপারে তেমন কোনো বিকট শব্দ পৌঁছায়নি।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ওপারে দুই পক্ষের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাঝে পড়ে সাধারণ রোহিঙ্গারাও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। চারদিকে বোমাবর্ষণ চলায় ওপারে থাকা লাখ লাখ মুসলিম রোহিঙ্গা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, যার ফলে যেকোনো মুহূর্তে তারা সীমান্ত পেরিয়ে এপারে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করতে পারে। এর আগে গত বছরও রাখাইনে সংঘাতের জেরে প্রায় লক্ষাধিক নতুন রোহিঙ্গা ধাপে ধাপে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছিল।
সীমান্তের বাসিন্দাদের চোখে পুরোনো আতঙ্ক
রাখাইনের সংঘাতের আঁচ সরাসরি এসে পড়ে বাংলাদেশ সীমান্তের সাধারণ মানুষের ওপর। শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা শাহ আলম জানান, তার বাড়ি থেকে ওপারে আরাকান আর্মির চৌকি স্পষ্ট দেখা যায়। বুধবারের বিমান হামলার বিস্ফোরণের তীব্রতায় তাদের ঘরবাড়ি এমনভাবে কেঁপে উঠেছিল যে পুরো পরিবার চরম আতঙ্কের মধ্যে সময় কাটিয়েছে।
অনুরূপ ভয় কাজ করছে হোয়াইক্যং সীমান্তের বাসিন্দা আব্দুল গফুরের মনেও। তিনি জানান, প্রায় এক বছর আগের সংঘাতের সময় ওপার থেকে ছিটকে আসা গুলি এপারে একাধিক ঘরের দেয়ালে এসে লেগেছিল। ওপারে নতুন করে গোলাগুলির খবর পেলেই সীমান্তের মানুষের মনে সেই পুরোনো ও ভয়াবহ স্মৃতি দানা বেঁধে ওঠে।
সীমান্ত কঠোরভাবে সিল করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞের
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, চলমান সংঘাতের কারণে নতুন করে বহু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করতে পারে। তাই সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও কার্যকরভাবে সীমান্ত সিল করে রাখার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
প্রস্তুত বিজিবি ও প্রশাসন
নাফ নদী ও স্থল সীমান্তে নজরদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে বিজিবি। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. অনীক চৌধুরী বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার বিষয়ে টেকনাফ ব্যাটালিয়নের (২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন:
"সীমান্তের ওপারে বিস্ফোরণের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হলেও বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।"
তিনি আরও যোগ করেন:
"যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এ লক্ষ্যে টেকনাফ পৌরসভার নাইট্যংপাড়া, বরইতলী ও জাদিমোড়া সীমান্ত এলাকায় বিশেষ টহল, নাফনদীতে নৌ টহল এবং পুরো সীমান্তজুড়ে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।"
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
আলীখালী ক্যাম্পের শরণার্থী আজগর আলী ওপারের পরিস্থিতি বর্ণনা করে বলেন:
"গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার মংডু শহরে আরাকান আর্মির দখলে থাকা শহর ও গ্রাম পুনরুদ্ধারে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বিমান হামলা চালিয়েছে। সামনেও এ সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে। এতে অন্যদের পাশাপাশি রোহিঙ্গা মুসলিমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।"
আরেক রোহিঙ্গা ইদ্রিস মিয়া তাঁর স্বজনদের বরাত দিয়ে বলেন:
"মংডুতে থাকা আমার এক আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে জেনেছি, সেখানকার পরিস্থিতি এখন খুবই উত্তপ্ত। সহজে কেউ ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। অনেক রোহিঙ্গা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন।"
তিনি আরও বলেন:
"গত এক বছর আগে সংঘাতের সময় ধাপে ধাপে উখিয়া ও টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছিলেন। আমরা চাই, মিয়ানমারের রাখাইনে থাকা আমাদের রোহিঙ্গা ভাইয়েরা যেন নিরাপদে থাকতে পারেন।"