
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি মানিক মিয়াকে (৪০) তুলে নিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত তিন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে যুবদল ও ছাত্রদল। জনবিরোধী ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এদিকে, বাবার লাশ দাফনের অপেক্ষায় রেখে চোখের জলে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে নিহতের সন্তান।
বহিষ্কার যুবদল ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতা
হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক শোয়েব মুনশীকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় যুবদলের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এবং সংগঠনের নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (দপ্তরের দায়িত্বে) মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই আদেশ জারি করা হয়। যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন এমপির নির্দেশনায় এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট জানানো হয়, বহিষ্কৃতদের কোনো অপকর্মের দায় দল নেবে না এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
একই ঘটনায় ময়মনসিংহ উত্তর জেলা ছাত্রদলের সদস্য ও গৌরীপুর উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আল ইমরান খান এবং গৌরীপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রিফাত হাসানকেও বহিষ্কার করা হয়েছে। ময়মনসিংহ উত্তর জেলা ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মো. সাদ্দাম হোসেন তালুকদার স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়, যা অনুমোদন করেছেন জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নুরুজ্জামান সোহেল।
বাবার মরদেহ ঘরে রেখে পরীক্ষকেন্দ্রে সন্তান
হৃদয়বিদারক এই ঘটনার মধ্যেই বৃহস্পতিবার গৌরীপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে এইচএসসির বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষায় অংশ নিতে হয় নিহতের ছেলে আদিব মাহমুদ আলিফকে। বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখে পরীক্ষা দিতে আসায় কেন্দ্রের বাইরে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। অশ্রুসিক্ত চোখে পরীক্ষা কক্ষে প্রবেশ করলেও মানসিক যন্ত্রণায় নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট আগেই খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে আসে আলিফ।
অন্যদিকে, স্বামী মানিক মিয়াকে পিটিয়ে হত্যার বিচার চেয়ে বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাতে গৌরীপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন তার স্ত্রী মোছা. সুমাইয়া আক্তার সেলিনা।
জমি নাকি মাদক? নেপথ্যে যে কারণ
নিহতের ভাই সুখ মিয়া জানান, গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে মানিক মিয়া পৌর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মশার কয়েল কিনতে গেলে যুবদল নেতা শোয়েব মুনশীর নেতৃত্বে ১৪-১৫ জন তাকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর রাতভর দফায় দফায় নির্যাতন চালিয়ে তাকে গুরুতর আহত করা হয়। সুখ মিয়ার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বহিষ্কৃত যুবদল নেতা শোয়েব মুনশী।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
অভিযুক্ত শোয়েব মুনশী সাংবাদিকদের বলেন:
"আমি গৌরীপুর পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। একটি মহল ঈর্ষান্বিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা-ভিত্তিহীন অপবাদ ছড়াচ্ছে।"
হত্যাকাণ্ডের কারণ প্রসঙ্গে তিনি আরও দাবি করেন:
"তিনি এ বিষয়টি শুনেছেন। এ ঘটনায় তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ওদের মাদক সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল। মাদক ব্যবসার কারণে এ ঘটনা ঘটতে পারে।"
এদিকে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নুরুজ্জামান সোহেল বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন:
"শ্রমিক নেতা মানিক হত্যার অভিযোগে ছাত্রদলের দুই নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।"