
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শরণার্থী জীবন কাটানো মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত মানুষদের কণ্ঠে এখনো একটাই চাওয়া, নিরাপদে নিজ দেশে ফেরা। ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাবাসনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় তারা শরণার্থী পরিচয়ের বাইরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকুতি জানাচ্ছেন।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা। বর্তমানে তাদের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখের বেশি। এর পাশাপাশি নতুন করে আরও দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে বলে জানা গেছে।
উনচিপ্রাং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা হেদায়েতুল জান্নাত (৪৫) বলেন, ‘মিয়ানমারের রাখাইনে পরিবার-পরিজন নিয়ে খুব শান্তিতে দিন কাটিয়েছি। সেখানে কোনো কিছুর অভাব ছিল না, ছিল বড় বাড়ি, বিস্তৃত ভিটেমাটি। কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সব ফেলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে হয়েছে। আমরা কখনো ভাবিনি এভাবে শরণার্থী জীবন কাটাতে হবে। ক্যাম্পে খাবার পেলেও ঝুপড়ি ঘরে ছয় সন্তান নিয়ে কষ্টে জীবনযাপন করছি। তাই যেকোনোভাবে হোক, সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে মিয়ানমারে নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে যেতে চাই।’
একই অনুভূতি জানিয়ে নুরুল আমিন (৪৮) বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো জাতিই শরণার্থী জীবন চায় না। সবাই স্বাধীনতা, সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে নিজ দেশে বসবাস করতে চায়। কিন্তু মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর অত্যাচার ও নির্যাতনের কারণে আমরা নিজেদের ভিটেমাটিতে থাকতে পারিনি। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনেক ব্যবস্থা নিয়েছে। তবুও বর্তমানে ক্যাম্পের জীবন আর ভালো লাগছে না। মিয়ানমারে আমাদের চিংড়ি ঘের, ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুই ছিল। কিন্তু আজ নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে শরণার্থী হিসেবে দিন কাটাতে হচ্ছে।’
আরেক রোহিঙ্গা দিল বাহার (৫০) বলেন, ‘ক্যাম্পে খাবার পেলেও ঝুপড়ি ঘরের জীবন আর ভালো লাগছে না। বহু আশা নিয়ে অপেক্ষা করছি কবে আবার নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবো।’
ক্যাম্পগুলোতে শুধু প্রত্যাবাসনের অপেক্ষাই নয়, নতুন চ্যালেঞ্জও বাড়ছে বলে স্থানীয়রা জানান। হোয়াইক্যংয়ের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন জরুরি। তিনি বলেন, ‘স্থানীয়দের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মিশ্রণ ঘটছে এবং ক্যাম্পে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাঝেমধ্যে ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ঝগড়া ও বিবাদের ঘটনাও ঘটছে।’
তিনি আরও বলেন, ২০১৭ সালে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিলেও বর্তমানে এ সংখ্যা ১৪ লাখেরও বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন। দ্রুত ও কার্যকর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে নতুন করে ১ লাখ ৫২ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে।
কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে এখনও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তবে সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।
১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. কাউছার সিকদার বলেন, ক্যাম্পে সংঘটিত অধিকাংশ অপরাধ অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটে। এসব নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি ও নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অধিকাংশ রোহিঙ্গাই শান্তিপ্রিয় ও নিরীহ।