
জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক তিনটি স্থান থেকে দুই নারী ও এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (৯ জুন) দুপুর ১২টা থেকে শুরু করে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে এই লাশগুলো উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসা হয়। একই দিনে তিনজনের এমন রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তিরা হলেন—আক্কেলপুর পৌর শহরের খামার কেশবপুর গ্রামের উত্তম চৌধুরীর স্ত্রী সাবিত্রী চৌধুরী (২৫), রুকিন্দীপুর ইউনিয়নের আওয়ালগাড়ী বড় মসজিদ এলাকার নুরুল ইসলামের স্ত্রী বুলি বেওয়া (৭৬) এবং রায়কালী ইউনিয়নের দেওড়া গ্রামের কমল চন্দ্র বর্মণের ছেলে শিপন চন্দ্র বর্মণ (২৯)।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, আলাদা তিনটি আত্মহননের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলগুলোতে গিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করে। এরপর আইনগত প্রক্রিয়া শেষে লাশগুলো ময়নাতদন্তের জন্য জয়পুরহাট আধুনিক হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এই তিনটি ঘটনার প্রেক্ষিতে থানায় পৃথক অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
মৃতদের পরিবারের প্রাথমিক দাবি, সাবিত্রী চৌধুরী ঘরের ভেতর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে এবং বুলি বেওয়া ও শিপন চন্দ্র বর্মণ বিষাক্ত গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে নিজেদের জীবন শেষ করেছেন। তবে পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছে, এটি আত্মহত্যা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আসার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ঘটনার বিষয়ে সাবিত্রী চৌধুরীর স্বামী উত্তম চৌধুরী বলেন, “আমার স্ত্রী মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন এবং তার চিকিৎসা চলছিল। মঙ্গলবার সকালে আমি মাঠে ধান কাটার কাজে ছিলাম। পরে খবর পাই, তিনি গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। আমার শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকেও কোনো অভিযোগ নেই।” তিনি আরও জানান, “ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ গ্রহণের জন্য আমরা থানায় এসেছিলাম। কিন্তু আইনগত কারণে তা সম্ভব হয়নি।”
এদিকে অপর মৃত যুবক শিপন চন্দ্র বর্মণের বাবা কমল চন্দ্র বর্মণ আর্থিক অনটনের কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমার ছেলের কিছু ঋণ ছিল। এ কারণে সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল। মঙ্গলবার সকালে বাড়িতে বিষাক্ত গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।”
বৃদ্ধা বুলি বেওয়ার মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া অপমৃত্যু মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম জানান, ওই নারীর দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। স্বজনদের দেওয়া তথ্যমতে, সন্তানদের কাছ থেকে ঠিকমতো ভরণপোষণ ও দেখভাল না পাওয়ায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে গভীর মানসিক কষ্টে ভুগছিলেন। এই ক্ষোভ থেকে তিনি আগে থানায় একটি অভিযোগও দিয়েছিলেন। মঙ্গলবার তিনি নিজ বাড়িতে বিষাক্ত গ্যাস ট্যাবলেট সেবন করেন বলে তার পরিবার পুলিশকে অবহিত করেছে।
আইনি জটিলতার কারণে সাবিত্রী চৌধুরীর মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়া পাওয়ার দাবিতে তার পরিবার ও প্রতিবেশীরা বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত আক্কেলপুর থানায় অবস্থান নেন। তারা ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাহ করতে চেয়েছিলেন, তবে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে পুলিশ মরদেহ হস্তান্তর না করায় তারা ফিরে যেতে বাধ্য হন।
পুরো বিষয়টি নিয়ে আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন রেজা বলেন, “তিনটি মরদেহ উদ্ধার করে আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী বুধবার জয়পুরহাট আধুনিক হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হবে। স্বজনেরা আত্মহত্যার কথা বললেও মৃত্যুর সঠিক কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।”