
ময়মনসিংহে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত বিরোধের জেরে এক বিএনপি কর্মীকে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এলাকা। নিহত যুবকের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে বাড়ি নিয়ে আসার পরপরই বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে স্থানীয় জনতা। নিহতের স্বজনরা মাইকিং করে কোনো ধরনের সহিংসতা না করার জন্য বারবার অনুরোধ জানালেও, উত্তেজিত জনতা সব বাধা উপেক্ষা করে এক জামায়াত নেতার বাড়িসহ অন্তত ১২টি বসতঘরে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে।
বুধবার (৩ জুন) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ময়মনসিংহ নগরীর ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের চর ঈশ্বরদিয়া মধ্যপাড়া গ্রামে এই নজিরবিহীন ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা ঘটে। উত্তেজিত জনতা এ সময় একটি খড়ের গাদায় আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে দ্রুত কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এর আগে গত মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে জামায়াত নেতার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে একদল দুর্বৃত্ত হামলা চালিয়ে বিএনপি কর্মী রানাসহ ছয়জনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর জখম করে বলে অভিযোগ ওঠে।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মঙ্গলবার রাতেই নিহত রানার বড় ভাই মোফাজ্জর হোসেন বাদী হয়ে স্থানীয় জামায়াত নেতা মফিদুল ইসলাম মাস্টারসহ নামীয় ১০ জন এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১২ থেকে ১৩ জনকে আসামি করে কোতোয়ালী মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামি মফিদুল ইসলাম মাস্টার ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য। ঘটনার পর পুলিশ রাতেই বিশেষ অভিযান চালিয়ে ওই জামায়াত নেতার ছেলেসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—মহানগর জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মফিদুল ইসলাম মাস্টারের ছেলে মাহমুদুল ইসলাম মাহিন (২০), আলী হোসেনের ছেলে তোফাজ্জল হোসেন (৪০), তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে হুমায়ুন কবীর আকাশ (২৩) এবং চান মিয়ার ছেলে মনিরুল ইসলাম (২৪)। তারা সবাই ওই ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের চর ঈশ্বরদিয়া মধ্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা। আজ বুধবার দুপুরে আটক এই ৪ জনকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদনসহ আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। নিহত রানা মিয়া একই এলাকার মৃত শরাফ উদ্দিনের সন্তান। তিনি পেশায় একজন অটোরিকশাচালক ছিলেন এবং স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। এই হামলায় আহত অন্য ব্যক্তিরা হলেন—আশাদ (৩৬), মোফাজ্জল (৩৫), শাহান (৪৫), মুনসুর আলী (৫০), শাকিল (৩০) ও দিনি মিয়া (৩৫)।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ তুলে ধরে নিহত রানার স্বজন মাহাবুল বলেন, "জাতীয় নির্বাচনে আমরা বিএনপির পক্ষে কাজ করেছি ও ধানের শীষে ভোট দিয়েছি। এরপর থেকে জামায়াত নেতা মফিদুল ইসলাম মাস্টারের সঙ্গে আমাদের বিরোধ চলে আসছিল। গত সোমবার মফিদুল মাস্টারের বাড়ির ছেলেরা ফুটবল খেলা শেষে আমাদের বাড়ির সামনে কথা কাটাকাটি হয়। এতে মফিদুল মাস্টারের বাড়ির লোকজন ভোটের জেদ মেটাতে মারধরের হুমকি দিয়ে চলে যায়। এ ঘটনার পর রাতে আবারও মফিদুল মাস্টারের বাড়ির ছেলেরা আমাদের বাড়িতে হামলা করে। পরে মফিদুল মাস্টার নিজে আমাদের বাড়িতে এসে বিষয়টি মীমাংসা করে চলে যান। পরে মঙ্গলবার বিকেলে মফিদুল মাস্টার অন্তত ৫০ থেকে ৬০ জন লোকজন নিয়ে এসে হামলা করে। হামলার সময় মফিদুল মাস্টারের ছেলে মাহিন ছুরি দিয়ে রানার বুকের পাশে আঘাত করে। হামলায় আরও ৫ জন আহত হন। পরে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রানাকে মৃত ঘোষণা করে।"
তবে নিজের ও পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মফিদুল ইসলাম মাস্টার বলেন, "আমি বা আমার ছেলে ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলাম না। আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।"
একই সুর মিলিয়ে ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতের আমির কামরুল আহসান বলেন, "ঘটনাটি আমরা জেনেছি। এটি রাজনৈতিক কোনো বিষয় নিয়ে ঘটেনি। গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বে এ ঘটনা ঘটেছে।"
অন্য দিকে, ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ এই হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে বলেন, "নিহত রানা বিগত নির্বাচনে আমার পক্ষে এলাকায় কাজ করেছে। সে কৃষক দল তথা বিএনপির সক্রিয় কর্মী। ইতোমধ্যে চিহ্নিত গুপ্ত রাজনৈতিক দলের সদস্যরা আমাদের এ নিবেদিত কর্মীকে খুন করেছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হত্যায় জড়িত সবাইকে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলেছি।"
সার্বিক আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে কোতোয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিবিরুল ইসলাম জানান, "মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার পর গ্রেপ্তার ৪ জনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অপর আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।"