
নির্বাচনী সহিংসতার রেশ কাটতে না কাটতেই শেরপুরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিমকে ইট দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন জেলা জামায়াতের আমির হাফিজুর রহমান।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, এই হত্যার দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে অবিলম্বে মামলা করা হবে। তাঁর অভিযোগ, বিএনপি পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় না আনলে জামায়াতে ইসলামী কঠোর আন্দোলনে যাবে। সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি হলে তার দায় প্রশাসনকেই নিতে হবে।
নিহত রেজাউল করিম শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ফতেহপুর ফাজিল মাদ্রাসার প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
এর আগে বুধবার শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার আয়োজনে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে সংঘর্ষে আহত হন রেজাউল করিম। প্রথমে তাঁকে ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে শেরপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাত সাড়ে নয়টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
শেরপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসক উপল হাসান জানান, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
স্থানীয় ও উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে ওই নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সকাল থেকেই বিভিন্ন দলের প্রার্থী ও সমর্থকেরা অনুষ্ঠানস্থলে জড়ো হন। অনুষ্ঠানের সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আশরাফুল আলম রাসেল এবং প্রার্থীরা মঞ্চে ওঠার পর সামনের সারিতে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এ সময় সভামঞ্চের সামনে থাকা কয়েক শ চেয়ার ও একাধিক মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। এতে দুই দলের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। পরে সন্ধ্যায় ঝিনাইগাতী শহরে আবারও বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষ হয়, যেখানে উভয় পক্ষের আরও কয়েকজন আহত হন। এই সময় বিএনপির নেতাকর্মীরা রেজাউল করিমকে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করেন বলে জামায়াতের নেতাকর্মীদের অভিযোগ।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শ্রীবরদী উপজেলার গজরিপা ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল মান্নান বলেন, ‘বিএনপির নেতাকর্মীরা আমাদের ধাওয়া দেয়। এ সময় রেজাউল করিমকে তারা ধরে ফেলে এবং পরে ইট দিয়ে থেঁতলে দেয়।’
শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নূরুজ্জামান বাদল বলেন, এই ঘটনার পর নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তাঁর অভিযোগ, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ এবং ঘটনাটি বিএনপির পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি সঠিক তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
আজ সকালে নিহত রেজাউল করিমের বাড়ি শ্রীবরদী উপজেলার গজরিপা ইউনিয়নের চাউলিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর দাফনের প্রস্তুতি চলছে। কবর খোঁড়া হচ্ছে, আর পুরো গ্রাম শোকের আবহে নীরব। মরদেহ পৌঁছানোর অপেক্ষায় বাড়িতে ভিড় করছেন স্বজন ও এলাকাবাসী।
স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুর রহমান বলেন, ‘রেজাউল খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। এলাকায় তার যথেষ্ট জনপ্রিয়তা ছিল। তার মৃত্যুতে পুরো গ্রাম স্তব্ধ। আমরা এর বিচার চাই।’