
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) বর্তমান কমিটির ১০ মাসে বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৯ টাকা। এর মধ্যে তিনটি কর্মসূচি চলমান থাকলেও বাকি কর্মসূচিগুলো শেষ হয়ে গেছে। তবে এখনো ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৮ টাকার বিল বা ভাউচার জমা দেননি সংশ্লিষ্ট সম্পাদকরা। নিয়ম অনুযায়ী, কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার কথা। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে হিসাব জমা না দেওয়াকে ঘিরে আর্থিক অনিয়মের প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি রাকসুর কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের নথি বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
রাকসুর তহবিল থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ নিয়েছেন জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার। সাত ধাপে তিনি মোট ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা উত্তোলন করেন। এর মধ্যে ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার ব্যয়ের ভাউচার এখনো জমা পড়েনি।
জিএস আম্মার বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষার বুথ বসানো ৩ লাখ ২ হাজার টাকা ছিল প্রথমদিকের বাজেট। তখন ব্যয়ের ওপর ভ্যাট যোগ করার বিষয়টি জানা ছিল না। ফলে এই হিসাব সমন্বয় করে বিল করা একটু সমস্যা হয়েছে। ছাত্র সাংসদদের জন্য নেওয়া ১৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকার মধ্যে বিজ্ঞান সম্পাদকের হিসাব না আসায় বিলটি জমা দেওয়া হয়নি। বাকি হিসাব জমা দেওয়া হয়েছে।’
ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ ছয় ধাপে ১৩ লাখ ৪০ হাজার ৩২৪ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৪০০ টাকার ব্যয়ের হিসাব এখনো জমা দেননি তিনি।
নথি অনুযায়ী, গত ১৩ এপ্রিল দাপ্তরিক ব্যয়ের জন্য দেড় লাখ টাকা নিয়েছিলেন ভিপি। সেই অর্থের হিসাব জমা দেওয়ার আগেই ১৯ জুলাই একই খাতে আরও ২ লাখ টাকা উত্তোলন করেন তিনি।
ভিপি মোস্তাকুর বলেন, ‘একেবারে কোনো বিল জমা দেওয়া হয়নি বিষয়টি এমন নয়। এটি দ্রুত দেওয়া ভালো। তবে মেয়াদের মধ্যে জমা দিলেও হবে। আমাদের মেয়াদের এখনও ৬০ দিন বাকি।’
জিএসের পর রাকসুর তহবিল থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ নিয়েছেন ক্রীড়া সম্পাদক মোছা. নার্গিস খাতুন। সাত ধাপে তিনি ১৫ লাখ ৭১ হাজার ৬২৬ টাকা উত্তোলন করেন। এর মধ্যে ১৩ লাখ ৯৭ হাজার ১২৬ টাকার ভাউচার এখনো জমা দেননি।
সম্পাদক নার্গিস খাতুন জানান, গত মাসে শুরু হওয়া ছয়টি কর্মসূচির ‘রাকসু গেমস’ এখনো চলমান। এ কারণেই সংশ্লিষ্ট বিল জমা দেওয়া হয়নি।
বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর ছয় ধাপে ৮ লাখ ৪২ হাজার ৭৬৫ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে দুটি ভাউচার জমা দিয়েছেন তিনি। ইমরান লস্কর বলেন, ‘আমার বাজেট অনেকগুলো সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে করতে হয়। ফলে দুটি কর্মসূচি বিল জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। আমি আজকে বা কালকে বিলগুলো জমা দেব।’
সংস্কৃতি সম্পাদক জাহিদ হোসেন জোহা তিন ধাপে ৭ লাখ ৯৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান উদ্যাপনের জন্য নেওয়া ৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকার কোনো ভাউচার নথিতে জমা না পড়লেও তিনি ভাউচার জমা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুল সাকিব তিন ধাপে ৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার সবশেষ বাজেটের হিসাব দেওয়া হয়নি। সব হিসাব বুঝে নিয়ে কাল-পরশু বিল জমা দিয়ে দেব।’
মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. মুজাহিদ ইসলাম তিন ধাপে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪৪৮ টাকা উত্তোলন করেছেন। এর মধ্যে প্রকাশনার জন্য নেওয়া ১ লাখ টাকার ভাউচার জমা হয়নি।
মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সায়িদা হাফসা দুই ধাপে ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৭৬ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ টাকার হিসাব জমা পড়েনি। তিনি বলেন, ‘কালই জমা দিয়ে দেব।’
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ তোফা দুই ধাপে ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকার ব্যয়ের হিসাব জমা হয়নি।
পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ কোনো খাত উল্লেখ না করে ৮২ হাজার টাকা নিয়েছেন। ওই অর্থেরও কোনো হিসাব জমা দেননি তিনি।
এদিকে এজিএস এস এম সালমান সাব্বির গত ৫ মার্চ দাপ্তরিক ব্যয়ের জন্য ৬০ হাজার টাকা উত্তোলন করলেও এখনো তার হিসাব জমা দেননি।
রাকসুর সাবেক নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, কোনো সরকারি ব্যয় অগ্রিম নেওয়া হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তার হিসাব সমন্বয় করার নিয়ম রয়েছে। একটি বিলের হিসাব সমন্বয় করার পরই কেবল পরবর্তী ধাপে অর্থ উত্তোলন করা যায়।
তার ভাষায়, আগের বিলের হিসাব সমন্বয় না করেই কোনো সম্পাদক পরবর্তী বিলের টাকা উত্তোলন করলে সেটিকে আর্থিক অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি সম্পাদকীয় পদের জন্য নির্ধারিত বরাদ্দ থাকা উচিত এবং সব ব্যয়ের হিসাব রাকসুর সভায় উপস্থাপন করতে হবে। ওই সভায় সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষের উপস্থিত থাকার কথা। অনিয়মের ক্ষেত্রে কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব হলো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ফাইল আটকে দেওয়া।
অনেকগুলো কর্মসূচির ব্যয়ের বিল এখনো জমা না পড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান।
তিনি বলেন, ‘আসলে যে কোনো কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভাউচার জমা দেওয়া উচিত। আমরা তাদের সঠিক নিয়মে জমা দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছি।’
রাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি সভাতেই হিসাবের স্বচ্ছতা বজায় রাখার বিষয়ে প্রতিনিধিদের মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিনিধিরা হিসাব জমা দেওয়ার জন্য সময় চেয়েছেন। তার মতে, রাকসুকে অবশ্যই নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।