
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) জুলাই-৩৬ হলের এক আবাসিক ছাত্রীর বিরুদ্ধে সহপাঠী ও রুমমেটদের ব্যক্তিগত ও গোপনীয় ছবি অনুমতি ছাড়া লন্ডনপ্রবাসী প্রেমিকের কাছে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর অভিযুক্ত তুবাউল জান্নাত ঐশীকে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে হল প্রশাসন। একই সঙ্গে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অভিযুক্ত তুবাউল জান্নাত ঐশী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী এবং জুলাই-৩৬ হলের আবাসিক ছাত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান জানিয়েছেন, ঘটনার বিষয়ে কিছুটা স্বীকারোক্তি দেওয়ায় তাকে প্রাথমিকভাবে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।
ঘটনা তদন্তে হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. একেএম শামছুল হক ছিদ্দিকীর সই করা বিজ্ঞপ্তিতে কমিটি গঠনের তথ্য জানানো হয়। এতে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আরিফা আক্তারকে আহ্বায়ক, সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. খাইরুল ইসলামকে সদস্য এবং দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামানকে সদস্যসচিব করা হয়েছে।
এদিকে পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে জুলাই-৩৬ হলের আবাসিক ছাত্রীদের জানানো হয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কারও কোনো অভিযোগ থাকলে তা আগামী ৯ আগস্ট অফিস সময়ের মধ্যে প্রভোস্টের কাছে লিখিতভাবে জমা দিতে হবে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের দাবি, এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ জনের ছবি শনাক্ত করা হয়েছে এবং অভিযোগের সমর্থনে কিছু স্ক্রিনশটও তারা সংরক্ষণ করেছেন। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকেই এ ঘটনায় হলে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ছাত্রী হলের ভেতরে নিজেদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
অভিযুক্ত তুবাউল জান্নাত ঐশী বলেন, “আমি পরিস্থিতির শিকার হয়ে এসব ছবি তাকে পাঠিয়েছি। সে আমাকে একের পর এক ভিডিও কল দিত। আমি কোন পরিস্থিতিতে আছি, সেটা বোঝাতে রুমমেটদের ছবি পাঠাতাম। এছাড়া তারাও (রুমমেট) ওই ছেলেকে চিনত। এমনকি সে দেশে এলে তারা তার সঙ্গে দেখা করে ট্রিটও নিয়েছে। এক সপ্তাহ আগে সে আমাকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে আমি পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়েতে রাজি হইনি। তাই সে এখন আমার বিভিন্ন সময়ে পাঠানো ছবিগুলো নিয়ে প্রত্যেককে ইনবক্স করে এসব শুরু করেছে। আমি খুব বাজেভাবে ফেঁসে গেছি। এখন আমার 'সরি' বলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”
অন্যদিকে ঐশীর লন্ডনপ্রবাসী প্রেমিক আবিদ বলেন, “ঐশীর একাধিক ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। এ-সংক্রান্ত ছবি ও ভিডিওসহ বিভিন্ন প্রমাণ আমার কাছে আছে। সে যখন অন্য মেয়েদের ব্যক্তিগত ছবি আমাকে পাঠাত, তখন আমি তাকে বারবার নিষেধ করতাম। কিন্তু সে বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো হাসাহাসি করত। আমার কাছে মনে হতো, এসব করে সে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পেত। কোনো সুস্থ মানসিকতার মানুষ এমন আচরণ করতে পারে না। তার জন্য আমি অনেক অর্থ ব্যয় করেছি। শুধু তার কথা ভেবেই দুই মাস আগে লন্ডন থেকে দেশে এসে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও গিয়েছিলাম। আশা করেছিলাম, সময়ের সঙ্গে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এখন তার প্রকৃত আচরণ সবার সামনে এসেছে। সে আমার জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।”
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আরিফা আক্তার বলেন, “আমি অলরেডি কাজ শুরু করেছি। আগামীকাল কমিটির সদস্যদের নিয়ে বসব। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই এ তদন্তের রিপোর্ট দেব, ইনশাআল্লাহ।”
হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. একেএম শামছুল হক ছিদ্দিকী বলেন, “জুলাই ৩৬ হলে অন্যদের ছবি বয়ফ্রেন্ডদের কাছে পাঠানোর অভিযোগ পাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে সকালে হলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোট সাতটি অভিযোগ সংগ্রহ করেছি। হলবডি ও আবাসিক শিক্ষকদের নিয়ে মিটিং করে অভিযুক্ত ছাত্রীকে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার ও তার অভিভাবকের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেই।”
তিনি আরও বলেন, “এছাড়া, অধ্যাপক ড. খন্দকার আরিফা আখতারকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৯ তারিখ অফিস সময় পর্যন্ত আরও অভিযোগ জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, এবং ভবিষ্যতে রুমের ভেতরে টাচমোবাইলে ভিডিও কল বা অডিও-ভিডিও কল দেওয়া নিষিদ্ধ করে বারান্দা বা বাইরে গিয়ে কথা বলার নির্দেশনা দিয়ে নোটিশ জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, “অভিযোগের ব্যাপারে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত নিজেও কিছুটা স্বীকার করেছে। তাই তাকে প্রাথমিকভাবে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।”