
প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনাকে ঘিরে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নেতাদের সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষার্থীর দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কয়েক দফায় এ সংঘর্ষ চলে। এ সময় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ঢুকে তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। যদিও এ ঘটনায় ছাত্রশিবিরের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে সংগঠনটির নেতৃত্ব।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, রোববার সংস্কৃত বিভাগের এক ছাত্রী একই বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী মহসিন আলমের বিরুদ্ধে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেন। ঘটনার পর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানের উপস্থিতিতে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অভিযুক্ত পক্ষের সঙ্গে থাকা ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আনাস, হাসিব এবং সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসানসহ কয়েকজন অভিযোগ অস্বীকার করেন।
পরদিন সোমবার বিষয়টি নিয়ে আবারও বৈঠক হয়। বৈঠকে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার ও অন্য নেতারা আনাসকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী বলে অভিযোগ করেন। তাদের দাবি, আনাসের মোবাইল ফোনে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে তোলা ছবি পাওয়া গেছে। এরপর প্রক্টর দপ্তরে তাকে মারধরের ঘটনা ঘটে। পরে প্রক্টর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে সংশ্লিষ্টরা সেখান থেকে চলে যান।
এর কিছু সময় পর বিকেল ৩টার দিকে আনাস, হাসিব, মাহমুদুলসহ কয়েকজন রাকসু ভবনে গেলে সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিব আহত হন। পরে দুই পক্ষ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রথমে সেখানে বাগবিতণ্ডা হলেও পরে পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ সময় প্রক্টর কয়েকজন শিক্ষার্থীকে গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে নিয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, কিছুক্ষণ পর রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার, এজিএস সালমান সাব্বির, বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর, সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সিফাত আবু সালেহ, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মেহেদী হাসান, প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মেহেদী সজীব, দপ্তর সম্পাদক মানাজির আহাসান, অর্থ সম্পাদক শামীম পাটোয়ারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ও শাখা শিবিরের ক্যাম্পাস মনিটরিং কো-অর্ডিনেটর ফজলে রাব্বি মোহাম্মদ ফাহিম রেজা, শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলাম, শহীদ হবিবুর রহমান হল সংসদের ভিপি আহসানুল্লাহ ফারহান, জিএস আশিক শিকদার, নবাব আব্দুল লতীফ হলের জিএস নুরুল ইসলাম শহীদসহ কয়েকজন পাঠকক্ষে প্রবেশ করে আনাস, হাসিব ও মাহমুদুলকে মারধর করেন। বাধা দিতে গেলে সেখানে থাকা আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীও হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে।
পরে প্রক্টরিয়াল বডি, পুলিশ এবং উপস্থিত শিক্ষার্থীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, গুরুতর আহত মাহমুদুল হাসানকে হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও তাকে আবার মারধরের চেষ্টা করা হয়।
ঘটনার সময় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে থাকা পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হেলাল উদ্দীন বলেন, ‘আমরা পড়াশোনা করছিলাম। হঠাৎ একদল লোক রিডিং রুমে ঢুকে যাকে পাচ্ছে তাকেই ছাত্রলীগ বলে অভিযুক্ত করছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপরও হামলা করা হয়েছে। কেউ ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাকে মারধরের অধিকার কারও নেই। বিচারের জন্য রাষ্ট্রের আইন আছে।’
মারধরের শিকার আনাস বলেন, ‘প্রক্টর দফতরে আমাকে ছাত্রলীগের কর্মী আখ্যা দিয়ে মারধর করা হয়। পরে গ্রন্থাগারেও আবার হামলা চালানো হয়।’ তিনি দাবি করেন, তিনি ছাত্রলীগের কর্মী নন। অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে তার ছবি থাকলেও কখনো ছাত্রলীগের ব্যানারে বা কর্মসূচিতে অংশ নেননি।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, ‘এ ঘটনায় ছাত্রশিবিরের কেউ জড়িত ছিল না। রাকসু নেতাদের ওপর হামলার খবর পেয়ে আমরা সেখানে যাই।’ তবে হামলার ভিডিওতে ছাত্রশিবিরের নেতাদের দেখা যাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘রাকসু ভবনে এসে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের নেতাদের মারধর করেছে। প্রশাসনের কাছে তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলাম। পরে আমাদের ওপর হামলার পর আমরা সেখানে যাই।’
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ‘একটি ব্যক্তিগত বিরোধকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হয়েছে।’ তিনি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের মতো একটি শিক্ষাঙ্গনে হামলার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ঘটনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, ‘দিনব্যাপী যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। আমরা এখন পুলিশ প্রশাসন, প্রক্টরিয়াল বডির সঙ্গে একটি সভায় বসেছি। দ্রুত সময়ের ভেতর এই ঘটনা তদন্ত করতে একটি কমিটি গঠন করা হবে।’