
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন জিয়া পরিষদ, ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব) ও জামায়াতপন্থী শিক্ষক সংগঠন গ্রীণ ফোরাম এই মানববন্ধন করেন।
রবিবার (৮ মার্চ) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে এই মানববন্ধন হয়।
অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এয়াকুব আলী, ট্রেজারার অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম, রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মুনজুরুল হক, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওবাইদুল ইসলাম, প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. বেগম রোখসানা মিলি, থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সেকেন্দার আলি, জিয়া পরিষদ সভাপতি অধ্যাপক ড. ফারুকুজ্জামান, ইউট্যাব এর সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক ড. গফুর গাজী ও গ্রীণ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
এসময় নিহত আসমা সাদিয়া রুনার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া শাখা ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন সাবেক শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. রোখসানা মিলি বলেন, “ব্যক্তিগতভাবে আসমার সাথে আমার খুব বেশি সখ্যতা ছিল। কারণে অকারণে অফিসিয়াল ও অ্যাকাডেমিক কাজে সে আমার কাছে ছুটে আসতো। যতটা পেরেছি আমি তাকে সহায়তা করেছি। আমি এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি করছি এবং পরিবারটিকে সর্বোচ্চ আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করছি।”
ইউট্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক ড. গফুর গাজী বলেন, “রক্তের দাগ মুছতে না মুছতেই মধ্যযুগীয় বর্বরতায় কায়দায় আসমা ম্যামকে ব্যক্তিগত রুমে হত্যা করার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। অতিবিলম্বে হত্যাকারীদের আইনের আওতায় এনে এমন শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যাতে ইবিতে আর কোনো রক্ত আমাদের না দেখতে হয়।”
গ্রিন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আসমা ম্যাডাম একজন বিনয়ী, সজ্জন এবং মেধাবী শিক্ষিকা ছিলেন। উনার যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অতি দ্রুত এ হত্যাকাণ্ডের সাথে যারা জড়িতদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি অনিরাপদ স্থানে অবস্থিত তাই ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাচ্ছি। একইসঙ্গে অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মরতদের ডাটা সংগ্রহ করে তাদের একটি করে আইডি কার্ড দিয়ে নিজেদের আওতায় রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে, অফিস ছুটি হলে প্রতিটি ভবনের প্রতিটি এলাকায় আনসার দিয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।”
জিয়া পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. ফারুকুজ্জামান বলেন, “১৯৯৬ সালে চাকুরিতে জয়েন করার পর থেকে এ পর্যন্ত শিক্ষকদের উপর অনেক হামলার ঘটনা দেখেছি। আমরা প্রতিবাদ ও আন্দোলন করেছি কিন্তু একটি হামলার বিচারও আমরা পাইনি। এই বিচার না হওয়ার সম্মিলিত ফলাফলই হচ্ছে এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড। ক্রিমিনাল যখন বুঝতে পারে যে অপরাধ করলে কোনো শাস্তি হবে না, তখন সে নৃশংস থেকে নৃশংস হয়ে ওঠে। এরই একটা দৃষ্টান্ত আমরা দেখলাম। প্রশাসন এই খুনের বিচারের জন্য যত চেষ্টা সম্ভব করুন। যদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যেয়েও বিচার না পান, তখন আমরা রাস্তায় দাঁড়াবো।”
এসময় সম্মিলিত মানববন্ধনের সভাপতি অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন যার আহ্বায়ক হিসেবে আমি নিজে আছি। নিরপেক্ষ, পরিচ্ছন্নতা ও স্বচ্ছভাবে আমরা এই তদন্তের রিপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করব। আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে এবং আপনাদের সবার কাছে এ ব্যাপারে সহযোগিতা চাই। যদি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দৃশ্যমান কোনো কাজের অগ্রগতি না দেখাতে পারেন, তবে ঈদের পরে আমরা শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে বৃহত্তর কর্মসূচির দিকে যাব।”
এসময় উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, “শিক্ষকদের এই দাবির প্রতি আমরা উদাত্ত সংহতি প্রকাশ করছি। রুনার পরিবারকে আমরা প্রয়োজনীয় সকল সহযোগিতা প্রদান করব। এই বিচারের দাবি পূরণের জন্য রাজনৈতিক সরকারের যে পর্যায়ে যাওয়া লাগে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সে পর্যায়ে যাবে। আমরা বিভাগ যাতে সচল রাখার ব্যবস্থা করেছি। রুনার স্মৃতিকে যাতে ধারণ করা যায় সে ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের দাবির পূরণের ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিব। অপরাধী চিহ্নিতকরণ, গ্রেপ্তার এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষেত্রে প্রশাসন যত ধরনের সহযোগিতা চাবে, আমরা তার সবটুকু প্রদান করব।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের উদ্যোগে নিহত আসমা সাদিয়া রুনার স্মরণে এক শোক সভার আয়োজন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র নজরুল কলা ভবনের গগন হরকরায় এটি হয়। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় মসজিদে দোয়া ও মাহফিলের আয়োজন করা হয়।
৪ মার্চ আনুমানিক বিকাল ৪টার দিকে থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনে আসমা সাদিয়া রুনার নিজ অফিস কক্ষে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে। পরে ওই কক্ষেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমানকেও আত্মহননের চেষ্টা অবস্থায় দেখেছেন বলে জানান চিৎকার শুনে উদ্ধার করতে যাওয়া আনসার সদস্য ও কয়েকজন শিক্ষার্থী। পরে খবর পেয়ে প্রক্টরিয়াল বডি ও ইবি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উভয়ের রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাদের কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে পাঠালে চিকিৎসক শিক্ষিকাকে মৃত ঘোষণা করেন।