
পটুয়াখালী জেলা শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তরে, কুয়াকাটা মহাসড়কের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এক টুকরো আধুনিক তিলোত্তমা—পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি)। ১০৯.৯৭ একরের এই সবুজ শ্যামল ক্যাম্পাসটি আজ শুধু উচ্চশিক্ষার একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বপ্নের বাতিঘর।
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের পটুয়াখালী জেলার দুমকি উপজেলায় অবস্থিত পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি উপকূলীয় অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার এক অনন্য কেন্দ্র। আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর এবং নিজস্ব ঐতিহ্য আর স্বতন্ত্র ধারায় পরিচালিত দক্ষিণবঙ্গের প্রথম সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠের নানা চড়াই, উৎরাই ও উদ্ভাবন পেরিয়ে ২৩ থেকে ২৪এ পা রাখছে বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি)।
ইতিহাসের সোনালী পথরেখা
পবিপ্রবির যাত্রা এক দীর্ঘ বিবর্তনের ফসল। এক সময়ের বেসরকারি 'জনতা কলেজ' থেকে এটি বেসরকারি কৃষি কলেজ এবং পরবর্তীতে পটুয়াখালী কৃষি কলেজ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এই অঞ্চলের মানুষের উচ্চশিক্ষার পথ প্রশস্ত করতে ২০০১ সালের ১২ জুলাই জাতীয় সংসদে ‘পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ পাস হয়। এরপর ২০০২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি (১৪ ফাল্গুন ১৪০৮ বঙ্গাব্দ) সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে এই পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতি বছর ২৬ ফেব্রুয়ারি দিনটি অত্যন্ত মর্যাদার সাথে 'বিশ্ববিদ্যালয় দিবস' হিসেবে উদযাপিত হয়।
ভিশন ও অঙ্গীকার: প্রযুক্তির মাধ্যমে মুক্তি
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল স্লোগান—"মানসম্পন্ন প্রযুক্তিসমৃদ্ধ উচ্চ শিক্ষাই হোক দিন বদলের হাতিয়ার।" পবিপ্রবি শুধু জ্ঞান বিতরণ নয়, বরং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ ও আলোকিত জনবল তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের অঙ্গীকারে ধ্বনিত হয়— "আমরা শিখবো, লড়বো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাসযোগ্য মাতৃসম বাংলাদেশ গড়বোই।"
একাডেমিক উৎকর্ষ ও অনুষদসমূহ
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯ টি শক্তিশালী অনুষদের অধীনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে কৃষি, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যবসায় প্রশাসন, মাৎস্যবিজ্ঞান, এ্যানিমাল সায়েন্স এন্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট, নিউট্রিশন এন্ড ফুড সায়েন্স , 'ল’ এন্ড ল্যান্ড এডমিনিস্ট্রেশন এবং ওশানোগ্রাফি
অনুষদ অন্যতম। প্রতিটি অনুষদের পাঠদান ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা শিক্ষার্থীদের বিশ্ববাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলে।
আধুনিক গবেষণা ও অবকাঠামো
পবিপ্রবি তার উন্নত গবেষণা সুবিধার জন্য সুপরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে:
গবেষণাগার ও খামার: আইটি ল্যাব, প্ল্যান্ট বায়োটেকনোলজি ল্যাব এবং ইনোভেশন ডিসেমিনেশন সেন্টারসহ বিভিন্ন বিষয়ের আধুনিক গবেষণাগার ও খামার।
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার: এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যের ভাণ্ডার। প্রায় ২৮,০৩০টি বই এবং দেশি-বিদেশি অসংখ্য ই-জার্নালের সংগ্রহ রয়েছে এখানে। এটি ইউজিসি ডিজিটাল লাইব্রেরির সদস্য হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বিশ্বের নামী পাবলিশার্সের তথ্য এক্সেস করতে পারে।
টিএসসি ও অডিটোরিয়াম: ৪ তলা বিশিষ্ট ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র (টি এস সি) এবং ৪৫০ আসন বিশিষ্ট অডিটোরিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল চর্চার কেন্দ্রবিন্দু।
বীরত্ব ও ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতিচ্ছবি
বিশ্ববিদ্যালয়টি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক জীবন্ত স্মারক। প্রশাসনিক ভবনের সম্মুখে স্থাপিত সাত বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য প্রতিদিন নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমের পাঠ দেয়। এছাড়াও রয়েছে ভাষা শহীদদের স্মরণে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। ক্যাম্পাসে ধর্মীয় সম্প্রীতির নিদর্শন হিসেবে রয়েছে কেন্দ্রীয় মসজিদ এবং শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ কেন্দ্রীয় মন্দির।
আবাসন ও সুযোগ-সুবিধা
শিক্ষার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার জন্য মূল ক্যাম্পাসে ৬টি এবং বরিশাল ক্যাম্পাসে ২টি—মোট ৮টি আবাসিক হল রয়েছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সমৃদ্ধ ৪ তলা বিশিষ্ট হেলথ কেয়ার সেন্টার শিক্ষার্থীদের ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা সেবা প্রদান করে। যাতায়াতের জন্য রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাস সার্ভিস, যা নিয়মিতভাবে পটুয়াখালী ও বরিশাল রুটে যাতায়াত করে।
দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষা বিস্তারে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এক যুগান্তকারী নাম। আধুনিক কারিকুলাম, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং গবেষণার অনুকূল পরিবেশ নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাচ্ছে এক নতুন দিগন্তের দিকে। মানসম্পন্ন শিক্ষা আর প্রযুক্তির সমন্বয়ে পবিপ্রবি আজ শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।