
সীমান্তে চলমান পুশ-ইন, হত্যা ও বিভিন্ন অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে আজ শুরু হচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের চার দিনব্যাপী সীমান্ত সম্মেলন। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল এবার নয়াদিল্লিকে এসব ইস্যুতে কড়া বার্তা দেবে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন, আকাশসীমা লঙ্ঘনসহ একাধিক অভিযোগকে কেন্দ্র করেই মূল আলোচনা সাজানো হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সম্প্রতি ‘পুশ-ইন’ ইস্যু নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। দেশের উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে নারী-শিশুসহ বহু মানুষকে জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের বিরুদ্ধে। বিজিবি বহু ক্ষেত্রে এসব চেষ্টা ব্যর্থ করলেও ঘটনাগুলো দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ সূত্রে জানা গেছে, এবারের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সীমান্তে সংঘটিত প্রতিটি অভিযোগ, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, মানবাধিকার ইস্যু এবং সাম্প্রতিক ঘটনার বিস্তারিত তালিকা তুলে ধরা হবে। বিজিবির পক্ষ থেকে বিশেষভাবে সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইনকে প্রধান এজেন্ডা হিসেবে রাখা হয়েছে এবং এ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রতিবাদ জানানো হবে।
বিজিবি সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম জানান, সম্মেলনে সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইনের সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরে কড়া প্রতিবাদ জানানো হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলোও উপস্থাপন করা হবে।
তিনি আরও জানান, আলোচনায় আকাশসীমা লঙ্ঘন করে ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার, মাদক ও চোরাচালান, অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপন, স্থায়ী সীমান্ত পিলার নির্মাণ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ইস্যুও থাকবে। একই সঙ্গে ভারতীয় গণমাধ্যমে সীমান্ত নিয়ে উসকানিমূলক ও মিথ্যা সংবাদ প্রচারের অভিযোগও তুলে ধরা হবে।
বিজিবি বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে একাধিক পুশ-ইন চেষ্টা হয়েছে। ৩ থেকে ৬ জুনের মধ্যে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় মোট ২৩টি পুশ-ইনের চেষ্টা হয়, যেখানে দুই শতাধিক মানুষকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে প্রতিটি ঘটনাই বিজিবি ঠেকিয়ে দেয়।
বিজিবি সূত্র আরও জানায়, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৪৬৩ জনকে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক ব্যক্তি পরে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত হন এবং কয়েকশ রোহিঙ্গাও ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৩৪৪ জনকে পুশ-ইন করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২৬ জন ভারতীয় ও ৩৯ জন রোহিঙ্গা নাগরিক বলে তথ্য রয়েছে।
অন্যদিকে ভারতীয় পক্ষের দাবি, যাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে তারা বাংলাদেশি নাগরিক। তবে বাংলাদেশ জানিয়ে দিয়েছে, যাচাই ছাড়া কাউকে গ্রহণ করা হবে না।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তিকে নাগরিক দাবি করলেই সীমান্তে ঠেলে দেওয়া যায় না। নাগরিকত্ব যাচাই, কনস্যুলার যোগাযোগ এবং সম্মতিপূর্ণ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ছাড়া এমন পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার নীতির পরিপন্থি।
বিজিবির অবস্থানও একই। কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম বলেন, কেউ বাংলাদেশি হলে প্রমাণ সাপেক্ষে গ্রহণে আপত্তি নেই, তবে যাচাই ছাড়া সীমান্তে এনে ছেড়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, সীমান্তে প্রতিটি পুশ-ইন চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে এবং নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে। তার ভাষায়, এক দেশের গরুও অন্য দেশে পাঠাতে হলে প্রক্রিয়া লাগে, সেখানে মানুষকে রাতের অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই বৈধ নয়।
সম্মেলনে শুধু পুশ-ইন নয়, সীমান্ত নিরাপত্তা, ড্রোন ও হেলিকপ্টার অনুপ্রবেশ, নদী ও পরিবেশগত সমস্যা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুও আলোচনায় থাকবে। বিশেষ করে ত্রিপুরার শিল্পবর্জ্য বাংলাদেশের আখাউড়া অঞ্চলে প্রবেশের বিষয় এবং তা বন্ধে ইটিপি স্থাপনের প্রস্তাবও উত্থাপন করা হবে।
বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল এতে অংশ নিচ্ছে। অন্যদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারের নেতৃত্বে ভারতের প্রতিনিধি দল সম্মেলনে উপস্থিত থাকবে।