
মুম্বাইয়ের অভিজাত জুহু এলাকায় অভিনেতা টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এনেছে বলিউড তারকা সালমান খান ও গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বিরোধ। রোববার পুষ্পা নার্সারি পার্কের বাইরে এ ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি ভারতজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
এদিকে গ্যাংস্টার অনিল পণ্ডিতের একটি অডিও রেকর্ডিং ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে অস্পষ্ট কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, ‘সালমান খানকে ক্ষমা চাইতে হবে।’ একই সঙ্গে গুলির ঘটনার দায়ও তিনি স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
সালমানকে ঘিরে এই বিরোধের শিকড় ১৯৯৮ সালে। সে বছর রাজস্থানের যোধপুরে ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ সিনেমার শুটিং চলাকালে অভিনেতার বিরুদ্ধে বন্য প্রাণী শিকারের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সময়ে এই ঘটনা শুধু দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের জন্ম দেয়নি, বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ তৈরি করে।
১৯৯৮ সালের হরিণ শিকারের ঘটনায় যেভাবে বিরোধের সূত্রপাত
১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে প্রায় তিন সপ্তাহ যোধপুরে অবস্থান করেছিলেন সালমান খান। ওই সময় শহরটির আশপাশের গ্রামাঞ্চলে শিকারে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে ভাবাদ গ্রামে দুটি চিঙ্কারা হরিণ হত্যা করেন তিনি। এ ঘটনায় মামলা হলে পরবর্তী সময়ে রাজস্থান হাইকোর্ট তাকে খালাস দেন। একইভাবে ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে লুনির ঘোড়া ফার্মে আরও দুটি চিঙ্কারা হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ মামলায় দেওয়া রায়ও ২০১৬ সালে রাজস্থান হাইকোর্ট বাতিল করেন।
তবে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি ছিল বিপন্ন প্রজাতির কৃষ্ণসার হরিণ হত্যার। অভিযোগ অনুসারে, ১ ও ২ অক্টোবর রাতে কানকানি গ্রামে দুটি কৃষ্ণসার হরিণ মারা হয়। এ ঘটনায় ২০১৮ সালে সালমানকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। ওই রায়ের বিরুদ্ধে তার করা আপিল এখনো বিচারাধীন।
সিনেমাটির সহশিল্পী নীলম, তাবু, সোনালি বেন্দ্রে ও সইফ আলি খানও ওই রাতে সালমানের সঙ্গে ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ মামলায় তাদেরও সহ-অভিযুক্ত করা হয়। বিচারিক আদালত অবশ্য তাদের খালাস দেন। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরকারের করা আপিলও এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
কেন বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে কৃষ্ণসার শিকার এত গুরুত্বপূর্ণ
রাজস্থানের যোধপুর ও আশপাশের অঞ্চলে বসবাসকারী বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাসে প্রকৃতি ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তাদের জীবনাচরণে ২৯টি নিয়ম রয়েছে, যার অন্যতম হলো অহিংসা চর্চা এবং গাছপালা, পশুপাখি ও পরিবেশ রক্ষা করা।
বিশেষ করে কৃষ্ণসার ও চিঙ্কারা হরিণ সংরক্ষণে সম্প্রদায়টির সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। তাদের দৃষ্টিতে, একজন জনপ্রিয় অভিনেতা তাদের বসবাসের এলাকায় এসে প্রকাশ্যে হরিণ শিকার করেছেন—এটি শুধু আইন লঙ্ঘনের ঘটনা নয়, তাদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রতিও অসম্মান।
কানকানিতে শিকারের ঘটনার রাতে গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সালমানের গাড়ির পিছু নেওয়া এবং বন বিভাগের কাছে অভিযোগ দায়ের করার ঘটনাও সামনে আসে। পরবর্তী সময়ে সম্প্রদায়ের সদস্যরা মামলার সাক্ষী হন এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন।
বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের সদস্যরা যোধপুরের সড়ক, আদালত ও থানার সামনে বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ করেছেন। তাদের সক্রিয়তার কারণে মামলাটি জনপরিসরে আলোচনায় থাকে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরও চাপ বজায় থাকে। প্রায় দুই দশক ধরে মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সম্প্রদায়টির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করা আইনজীবী মহীপাল বিষ্ণোই বলেন, সম্প্রদায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত না থাকলে এ মামলায় সাজা হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল।
তার ভাষ্য, সালমান দুটি কৃষ্ণসার হরিণ হত্যার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। মামলাটি বদলির আবেদনের মাধ্যমে হাইকোর্টে গেছে। সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে তিনি নিজে ২০ বছর ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছেন বলেও জানান।
লরেন্স বিষ্ণোইয়ের উত্থান ও সালমানকে হত্যার হুমকি
সালমান খানের সঙ্গে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের বিরোধ আলোচনায় আসে অনেক পরে। ২০১৮ সালে যোধপুরের একটি আদালতে চাঁদাবাজির অন্য একটি মামলায় হাজির করা হয়েছিল লরেন্সকে। আদালত থেকে বের হওয়ার সময় অপেক্ষমাণ টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে তিনি বলেছিলেন, ‘সালমান খানকে এই যোধপুরেই মারা হবে, তখন সে আমাদের আসল পরিচয় বুঝতে পারবে।’
এই বক্তব্যের পরই দেশজুড়ে পরিচিতি পেতে শুরু করেন লরেন্স।
কারাগারে থাকা অবস্থায়ও তিনি বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের ক্ষোভকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করেছেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। সালমানকে ঘিরে বিতর্কিত শিকার মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে চললেও দ্রুত নিষ্পত্তির কোনো লক্ষণ ছিল না। এই পরিস্থিতিতে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুভূতির প্রসঙ্গ সামনে এনে নিজেকে সম্প্রদায়ের মূল্যবোধের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেন লরেন্স। একই সঙ্গে একজন সুপারস্টারকে হত্যার হুমকি দিয়ে গণমাধ্যমের শিরোনামেও জায়গা করে নেন।
উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে শিকারের অভিযোগ ওঠার সময় লরেন্স নাবালক ছিলেন এবং পাঞ্জাবে নিজের বাড়িতে থাকতেন। অর্থাৎ, মূল ঘটনাটির সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার তথ্য নেই। তা সত্ত্বেও বহুল আলোচিত এই মামলাকে ব্যবহার করে অপরাধজগতে নিজের পরিচিতি ও প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
চাঁদাবাজিই কি গ্যাংয়ের মূল উদ্দেশ্য?
রাজস্থানের অ্যান্টি-গ্যাংস্টার টাস্ক ফোর্সের প্রধান এম এন দীনেশের মতে, সালমান খানকে ঘিরে বিরোধ গ্যাংটির প্রচার বাড়ানোর একটি মাধ্যম। এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য চাঁদাবাজি।
দীনেশ বলেন, আলোচিত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে গুলির মতো ঘটনা ঘটিয়ে অপরাধী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে তুলে ধরে এবং চাঁদাবাজির জগতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। সাধারণত তারা এ ধরনের হামলায় ভাড়াটে শুটার ব্যবহার করে।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো শুটার দক্ষতা দেখাতে ব্যর্থ হলে তাকে পরিত্যাগ করা হতে পারে, যাতে সে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। তবে দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বা সম্ভাবনাময় দক্ষ বন্দুকধারীর ক্ষেত্রে পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও করে রাখে গ্যাংগুলো।
রাজস্থানের অ্যান্টি-গ্যাংস্টার টাস্ক ফোর্স এ ধরনের বেশ কয়েকজন ভাড়াটে খুনিকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, সম্প্রতি রাজস্থানে কংগ্রেসের এক সাবেক বিধায়ককে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। তবে যোধপুরে শুটারদের আটক করা সম্ভব হওয়ায় তারা ওই ব্যক্তির কাছে পৌঁছাতে পারেনি।
বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের অবস্থান: বিচার চাই, সহিংসতা নয়
সালমানের শিকার মামলা নিয়ে যোধপুরে মতভেদ রয়েছে। বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের অনেকের কাছে বিষয়টি এখনো আবেগের সঙ্গে জড়িত। তবে সবাই যে লরেন্সের সহিংস অবস্থান সমর্থন করেন, তা নয়।
বিষ্ণোই টাইগার ফোর্সের সাধারণ সম্পাদক রাম নিবাস বিষ্ণোই বলেন, সালমান খানের শিকার মামলায় তাদের সম্প্রদায় এখনো ন্যায়বিচার পায়নি বলে মনে করে। চিঙ্কারা হত্যার মামলায় অভিনেতা হাইকোর্ট থেকে খালাস পেয়েছেন এবং কৃষ্ণসার হত্যার মামলায় তার আপিল বিচারাধীন রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে বিশেষ অনুমতি চেয়ে করা আবেদনের ক্ষেত্রেও রাজ্য সরকার যথেষ্ট জোরালো ভূমিকা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে সালমানের মৃত্যুর বদলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষেই অবস্থান জানিয়েছেন রাম নিবাস।
তিনি বলেন, ‘আমরা সালমানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা চাই, তার মৃত্যু চাই না।’ তার মতে, বিষ্ণোই সম্প্রদায় গাছপালা, পশুপাখি ও পরিবেশ রক্ষায় বিশ্বাসী এবং অহিংসার অনুসারী। তাই সহিংসতার ডাক দেওয়া কিংবা তা সমর্থন করা তাদের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সালমানের আদালতে হাজিরাকে কেন্দ্র করে যোধপুরে বিভিন্ন সময় বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়েছেন রাম নিবাস। তবে মামলাটি বিচারাধীন থাকায় এবং বদলির আবেদন হাইকোর্টে যাওয়ায় শুনানিতে সালমানকে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকতে হয় না। এতে মামলাটি ঘিরে উত্তেজনা কিছুটা কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
লরেন্সের বক্তব্য থেকে দূরত্ব রাখছে সম্প্রদায়ের একাংশ
যোধপুর জেলা বিষ্ণোই মহাসভার সভাপতি নারায়ণ রাম বিষ্ণোই জানিয়েছেন, লরেন্স বিষ্ণোইয়ের বক্তব্য সম্পর্কে তাদের কাছে সরাসরি যাচাই করা তথ্য নেই। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমেই তারা এসব বক্তব্য জানতে পারেন।
তার ভাষ্য, কোনো সম্প্রদায় হিসেবে অপরাধমূলক বা অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করার সুযোগ নেই।
তবে বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কিছু নেতা সালমানের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। অখিল ভারতীয় বিষ্ণোই মহাসভার দেবেন্দ্র বুধিয়ার মতে, সালমান খান বিকানেরের মুক্তি ধামে গিয়ে ক্ষমা না চাইলে এই বিরোধের অবসান হবে না। ওই স্থানে সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা গুরু জম্ভেশ্বরের সমাধি রয়েছে। বুধিয়ার দাবি, সেখানে গিয়ে হরিণ হত্যার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে অভিনেতাকে।
তার এই বক্তব্যের সঙ্গে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের দাবির মিল রয়েছে। তবে সম্প্রদায়ের অন্য নেতারা সহিংসতার পথ প্রত্যাখ্যান করে আইনি প্রক্রিয়ার ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সালমান খানকে ঘিরে ১৯৯৮ সালের শিকার মামলা এখনো আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কৃষ্ণসার হত্যার অভিযোগ, সম্প্রদায়ের ক্ষোভ এবং ক্ষমা চাওয়ার দাবি পুরোপুরি শেষ হয়নি।
টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনাটি নতুন করে সেই বিরোধকে আলোচনায় এনেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, অপরাধী গোষ্ঠীগুলো কি ধর্মীয় অনুভূতি ও সাংস্কৃতিক বিরোধকে নিজেদের পরিচিতি বাড়ানো এবং চাঁদাবাজির স্বার্থে ব্যবহার করছে?
ঘটনাটির সঙ্গে সালমানকে ঘিরে পুরোনো বিরোধের যোগসূত্র নিয়ে আলোচনা চললেও, গুলির ঘটনায় কারা জড়িত এবং এর প্রকৃত উদ্দেশ্য কী—তা নিশ্চিত করতে তদন্তের তথ্য প্রয়োজন।