
রংপুরের পীরগাছায় কৃষি সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে স্বজনপ্রীতি, দলীয় প্রভাব বিস্তার ও বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি তালিকার সঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকার নামের মিল পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্বাক্ষর করা দলীয় প্যাডের তালিকায় যাঁদের নাম ছিল, তাঁদেরই কয়েকজন শেষ পর্যন্ত সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন।
গত ৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয় সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশ করে। এতে পীরগাছা উপজেলার নয়জনের পাশাপাশি রংপুর সদর উপজেলার চারজন, কাউনিয়ার ছয়জন, তারাগঞ্জের তিনজন, বদরগঞ্জের নয়জন, মিঠাপুকুরের ১৪ জন, পীরগঞ্জের ১৬ জন, গঙ্গাচড়ার নয়জন এবং রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকার একজন ডিলার ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তালিকায় বলা হয়, জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর পাঠানো স্মারক এবং কেন্দ্রীয় সার ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন অনুযায়ী আবেদনকারীদের অস্থায়ীভাবে ডিলার নিয়োগের পরবর্তী কার্যক্রম নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্ত পূরণের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকাটিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং কমিটির কৃষি অর্থনীতিবিদ শাহনাজ আক্তার স্বাক্ষর করেন।
দলীয় প্যাডের তালিকা থেকে চূড়ান্ত মনোনয়ন
বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ সেপ্টেম্বর ‘ডিলার নিয়োগ-২০২৬ এর তথ্য’ শিরোনামে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্বাক্ষর করা একটি তালিকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রংপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতির কাছে সুপারিশের তালিকা পাঠান।
নথিপত্রে দেখা গেছে, পীরগাছার নয়টি ইউনিয়নের জন্য প্রস্তুত করা ১৯ জনের প্রস্তাবিত তালিকায় বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের পাশাপাশি তাঁদের স্ত্রী, মেয়ে, ছেলে, শ্বশুর ও আত্মীয়স্বজনের নামও ছিল। তালিকায় আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের নাম থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।
চূড়ান্ত তালিকায় মনোনীত ব্যক্তিদের পরিচয় ও রাজনৈতিক পরিবারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কল্যাণী ইউনিয়নে জিকরুল আমিনের বেলী ফার্টিলাইজারকে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি ইউনিয়নটির চার নম্বর ওয়ার্ডের স্ব-চাষ এলাকার প্রয়াত আরমান আলীর ছেলে এবং কল্যাণী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি। উপজেলা বিএনপির সভাপতি স্বাক্ষরিত তালিকায়ও তাঁর নাম প্রথমে ছিল।
পারুল ইউনিয়নে মনোনয়ন পেয়েছে মো. আব্দুল মতিন সরকারের মেসার্স নুহা ট্রেডার্স। তিনি চার নম্বর ওয়ার্ডের তালুক পারুল গ্রামের তাহারত উল্লাহর ছেলে এবং ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সুপারিশ করা তালিকাতেও তাঁর নাম প্রথমে ছিল।
ইটাকুমারী ইউনিয়নে ছয় নম্বর ওয়ার্ডের মধুরাম গ্রামের প্রয়াত ময়েন উদ্দিনের ছেলে মো. আলিমুদ্দিনকে ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম মেহজাবিন ট্রেডার্স। আলিমুদ্দিনের ছোট জামাতা মাসুদ রানা ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।
অন্নদানগর ইউনিয়নে মনোনয়ন পেয়েছেন নয় নম্বর ওয়ার্ডের জগজীবন এলাকার জয়িতা আক্তার জিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম জয়িতা সার বিতান। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের প্রথম স্ত্রীর মেয়ে এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজে বাংলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের অনার্সের শিক্ষার্থী। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সুপারিশকৃত তালিকায়ও তাঁর নাম প্রথমে ছিল।
ছাওলা ইউনিয়নে জাকির হোসেনের মেসার্স আয়মান ট্রেডার্সকে ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি আট নম্বর ওয়ার্ডের আদম চাড়ালপাড়া গ্রামের আবু তাহেরের ছেলে এবং ইউনিয়ন বিএনপির সহকোষাধ্যক্ষ। দলীয় প্যাডে তৈরি তালিকা এবং উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সুপারিশের তালিকায় তাঁর নামও প্রথমে ছিল।
তাম্বুলপুর ইউনিয়নে মনোনয়ন পেয়েছেন সুইটি বেগম। তিনি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালিসের স্ত্রী। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স সামান্তা অ্যান্ড সিফা ট্রেডার্স।
পীরগাছা সদর ইউনিয়নে মোছা. সুলতানা ফেরদৌসীর রিয়া এন্টারপ্রাইজকে ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্ত্রী।
কৈকুড়ি ইউনিয়নে চার নম্বর ওয়ার্ডের চৌধুরী রানী গ্রামের মীর তৌফিক হাসান মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মীর আফসার আলীর ছেলে। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম মীর তৌফিক ট্রেডার্স। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সুপারিশ করা তালিকায়ও তিনি প্রথম ক্রমিকে ছিলেন।
কান্দি ইউনিয়নে মনোনয়ন পেয়েছে মেসার্স সান ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান। তিনি পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের তালুক কান্দি নিজপাড়া গ্রামের আব্দুল জলিলের ছেলে। তাঁর বড় ভাই আনিছুর রহমান ভুট্টু ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি।
সাত ইউনিয়নে ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ
স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর অভিযোগ, পীরগাছার বিভিন্ন ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তাঁদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কল্যাণী ইউনিয়নে ১৫ লাখ, ইটাকুমারীতে ১৭ লাখ, অন্নদানগরে ১৫ লাখ, পারুলে ১৮ লাখ, কান্দিতে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ, ছাওলায় ২৩ লাখ এবং কৈকুড়িতে ১৬ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সাত ইউনিয়নের কথিত অর্থের পরিমাণ যোগ করলে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা। এ ক্ষেত্রে দলটির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালিসের নামও সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্থানীয় নেতাকর্মীদের কেউ কেউ।
তাঁদের দাবি, ডিলার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এই দুই নেতা প্রভাব বিস্তার করেছেন। কোথাও পছন্দের ব্যক্তিকে ডিলার করার জন্য অর্থ লেনদেন হয়েছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগানো হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
স্থানীয় বিএনপি নেতা জিয়াউর রহমানও ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগে অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং পছন্দের প্রার্থীদের সুবিধা দেওয়ার বিষয়গুলো উঠে আসে।
তবে সার ডিলার নিয়োগে অর্থ গ্রহণের অভিযোগকে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে দাবি করেছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গা ও সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালিস। গত ২৫ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।