
শিশু ও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান একটি মামলার নিষ্পত্তিতে বড় অঙ্কের অর্থ দিতে সম্মত হয়েছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা। বুধবার করা সমঝোতা অনুযায়ী, আগামী ১০ বছরে প্রতিষ্ঠানটিকে মোট ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে। একই সঙ্গে শিশু ও কিশোরদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে বেশ কিছু নতুন বিধিনিষেধও চালু করতে হবে।
মেটার সঙ্গে এই সমঝোতা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ৫২ জন অ্যাটর্নি জেনারেলের একটি জোট। তবে সমঝোতায় পৌঁছালেও কোনো আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ স্বীকার করেনি মেটা।
অর্থের পরিমাণ বড় হলেও পুরো অর্থ একসঙ্গে পরিশোধ করতে হবে না। এক দশকজুড়ে ধাপে ধাপে অর্থ দেওয়ার সুযোগ থাকায় মেটার ওপর তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ তুলনামূলকভাবে কম থাকবে। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির মোট আয় ২০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ছিল।
সমঝোতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে শিশুদের জন্য মেটার প্ল্যাটফর্মে আসতে যাওয়া পরিবর্তনগুলোকে। নতুন ব্যবস্থায় শিশু ও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সময় এবং বিভিন্ন ফিচারে প্রবেশের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, শিশুদের অ্যাপ ব্যবহারের সময় প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টায় সীমিত করার ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি প্রতি ১৫ মিনিট পরপর ব্যবহারকারীদের বিরতি নেওয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়া হবে।
মেটা জানিয়েছে, কোনো অ্যাকাউন্টকে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীর হিসেবে শনাক্ত করা হলে সেটি রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ডিফল্টভাবে নিষ্ক্রিয় থাকবে। স্কুলের সময়ও সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বিজ্ঞপ্তি বন্ধ রাখার ব্যবস্থা থাকবে।
কিশোরদের পোস্টের জনপ্রিয়তা নিয়ে মানসিক চাপ কমাতেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় নিজের বা অন্যদের পোস্টে কতটি লাইক পড়েছে, সেই সংখ্যা ডিফল্টভাবে দেখা যাবে না।
তবে এসব বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে ব্যবহারকারীর বয়স নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের আলাদা করতে মেটাকে বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হবে।
বয়স শনাক্ত করতে বর্তমানে মুখমণ্ডল বিশ্লেষণ, সরকারি পরিচয়পত্র যাচাই এবং ব্যবহারকারীর অনলাইন আচরণ পর্যবেক্ষণের মতো বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। তবে এসব পদ্ধতির প্রত্যেকটিরই কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আচরণ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যেমন প্রাপ্তবয়স্ক কাউকে ভুলভাবে শিশু হিসেবে শনাক্ত করার সম্ভাবনা আছে, তেমনি শিশুকেও প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি রয়েছে।
সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগবিষয়ক অধ্যাপক অ্যালেক্সিস ইংবারের মতে, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তিনি মনে করেন, বর্তমান বয়স যাচাই প্রযুক্তি এখনো পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
অন্যদিকে আইনজীবী ফিলিপ ইয়ানেলা মনে করেন, গত কয়েক বছরে বয়স যাচাই প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। তার মতে, ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ না করেও বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব।
এ ধরনের ব্যবস্থায় প্রথমে একজন ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই করে একটি বিশেষ সংকেত তৈরি করা যেতে পারে। এরপর সেই সংকেত ব্যবহার করে ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট বয়সসীমার নিচে কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হবে। এতে মূল পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণের প্রয়োজন কমতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হচ্ছে না। তাদের আশঙ্কা, তথ্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ না করলেও বয়স যাচাইয়ের সময় সংবেদনশীল পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য অনলাইনে পাঠানোর ঝুঁকি থেকে যায়। শিশুদের পরিচয়পত্র বা মুখমণ্ডলের তথ্য ফাঁস হলে পরিচয় চুরিসহ গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ার মধ্যেই মেটার সঙ্গে এই সমঝোতা হলো। বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে শিশু ও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে নতুন আইন ও নীতিমালা গ্রহণ করছে।
সমঝোতার পর মেটা নিজেদের শিশু সুরক্ষা উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে টিকটক ও ইউটিউবের মতো অন্যান্য বড় প্ল্যাটফর্মকেও শিশুদের নিরাপত্তায় একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এখন মেটার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সমঝোতার শর্তগুলো বাস্তবে কার্যকর করা। শিশুদের দৈনিক ব্যবহারের সময় সীমিত করা, রাতে অ্যাকাউন্ট বন্ধ রাখা কিংবা স্কুল সময়ে বিজ্ঞপ্তি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথমেই ব্যবহারকারীর বয়স সঠিকভাবে শনাক্ত করতে হবে।
ফলে ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের এই সমঝোতার গুরুত্ব শুধু এর আর্থিক অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বয়স যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য ও গোপনীয়তা কতটা সুরক্ষিত রাখা যায়—শেষ পর্যন্ত সেটিই মেটার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।