
শ্রেণিকক্ষে কিছুটা শব্দ বা হট্টগোল করার অপরাধে কোমলমতি ১৬ জন শিক্ষার্থীকে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে জখম করার এক নৃশংস ঘটনা ঘটেছে খুলনার দাকোপে। উপজেলার রামনগর বীণাপানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘটা এই বর্বরোচিত কাণ্ডে স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রহারের শিকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে গুরুতর আহত দুজনকে তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে এবং বাকিদের স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক নিগ্রহ পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও প্রকাশ্য দিবালোকে এমন নিষ্ঠুরতায় তৈরি হওয়া পরিস্থিতি শান্ত করতে আজ শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে স্কুল প্রাঙ্গণে এক জরুরি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। তবে অভিযুক্ত শিক্ষকের তাৎক্ষণিক বদলির দাবিতে অনড় অভিভাবকেরা স্কুল কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে সন্তুষ্ট হতে না পেরে একযোগে সভাস্থল বর্জন করে চলে যান।
ভুক্তিভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ক্লাস চলাকালীন পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে কিছুটা শোরগোল করলে আচমকা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তরুণ কুমার মন্ডল। একপর্যায়ে তিনি শ্রেণিকক্ষে ঢুকে বাঁশের কঞ্চির লাঠি দিয়ে ১৬ জন শিক্ষার্থীকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্তাক্ত জখম করেন।
উদ্ভূত এই সংকট নিরসনে এবং বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আপস-মীমাংসা করতে শনিবার দুপুরে বিদ্যালয়ের সুধী সমাজ ও অভিভাবকদের নিয়ে বসা সালিশি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক সুকুমার গাইন। সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাবেক ইউপি সদস্য অমরেন্দ্রনাথ গাইন, ইউসুফ আলী মোল্যা, শিক্ষক শফিকুল ইসলাম, ইউপি সদস্য অশোক কান্তি গাইন, কনকলতা বিশ্বাস, প্রধান শিক্ষক কনক কান্তি রায়, দিপক বর্মন এবং অভিভাবক মিঠুন চক্রবর্তী ও সুব্রত গাইনসহ অনেকে।
বৈঠক চলাকালে উপস্থিত অভিভাবকেরা অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক তরুণ মন্ডলকে অবিলম্বে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অনত্র বদলি করার জন্য জোরালো দাবি তোলেন। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ এটি একটি দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং ‘এখনই বদলি করা সম্ভব নয়’ বলে জানালে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে অভিভাবকেরা একযোগে সভাস্থল ত্যাগ করেন।
নিজের কৃতকর্মের দায় স্বীকার করে অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক তরুণ মন্ডল অনুশোচনা প্রকাশ করে বলেন, "ভুলবশত এই ঘটনাটি ঘটে গেছে। আমার মাথায় হঠাৎ যে সে সময় কি হয়েছিলো আমি নিজেই জানি না। এমন ভুল আমার শিক্ষকতা জীবনে আগে কখনও হয়নি। আমি এই ঘটনার জন্য অনুতপ্ত এবং প্রতিটি অভিভাবকের কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়েছি।"
এ প্রসঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কনক কান্তি রায় বলেন, "এই বর্বরোচিত ঘটনায় আমরা নিজেরাও অত্যন্ত ব্যথিত। ঘটনার দিন আমি উপজেলা সদরে দাপ্তরিক কাজে ছিলাম। আমি স্কুলে উপস্থিত ছিলাম না। উদ্ভূত পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানের জন্য অভিভাবক ও সুধী সমাজকে নিয়ে বসা হয়েছিলো। অভিভাবকরা ওই শিক্ষককে বদলির দাবি তুলেছেন। কিন্তু সরকারি চাকরিজীবী বদলির একটি নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া থাকায় তাৎক্ষণিক তা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা ইতোমধ্যে পুরো বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানিয়েছি।"
পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রোকসানা আক্তার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, "এ ঘটনায় আমি সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্ত করতে বলেছি। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে ওই অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হবে।"