
২০১১ সালের ২ মে। পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন নেভি সিলদের ঝটিকা অভিযানে নিহত হন আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেন। এই অভিযানের রোমহর্ষক বিবরণ বিশ্ববাসী অনেকবার শুনলেও, ঠিক সেই মুহূর্তে পাকিস্তানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে কেমন অস্থিরতা বিরাজ করছিল, তা দীর্ঘকাল অজানাই ছিল। সম্প্রতি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির মুখপাত্র ফারহাতুল্লাহ বাবরের লেখা বই ‘দ্য জারদারি প্রেসিডেন্সি, নাও ইট মাস্ট বি টোল্ড’-এ উঠে এসেছে সেই ঝোড়ো দিনগুলোর অজানা নেপথ্যের কাহিনী।
একটি রহস্যময় ভোর ও বিভ্রান্তি
সকাল সাড়ে ৬টা। সচরাচর বিকেলে অফিস করা ফারহাতুল্লাহ বাবর প্রেসিডেন্টের এডিসির ফোন পেয়ে হকচকিত হয়ে যান। তড়িঘড়ি প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে পৌঁছানোর নির্দেশ পেয়ে তিনি বুঝতে পারেন বড় কিছু ঘটেছে। করাচির সাংবাদিক মাজহার আব্বাসের একটি ফোনকল তার সব ধোঁয়াশা পরিষ্কার করে দেয়—মার্কিন সেনারা অ্যাবোটাবাদে বিন লাদেনের আস্তানা খুঁজে পেয়েছে।
সেদিন ভোরে প্রেসিডেন্টের এডিসি স্কোয়াড্রন লিডার জালাল প্রথম আঁচ করতে পেরেছিলেন যে কিছু একটা গড়বড় হয়েছে। রাত আড়াইটায় তিনি খবর পান অ্যাবোটাবাদে একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়েছে। বিমান বাহিনীর অফিসার হিসেবে তিনি জানতেন, রাতে পাকিস্তানি পাইলটদের হেলিকপ্টার চালানোর অনুমতি নেই। তাহলে সেই আকাশে ডানা মেলা ওই যানটি কার ছিল? এই প্রশ্নই তাকে অস্থির করে তুলেছিল।
জারদারিকে ওবামার সেই ঐতিহাসিক ফোন
আর্মি হাউসের অপারেটর যখন প্রেসিডেন্ট প্রাসাদকে জানান যে সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক কায়ানি সেখানে আসছেন, তখন পরিস্থিতির গুরুত্ব সবাই টের পান। কিছুক্ষণ পরই খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ফোন করেন আসিফ আলি জারদারিকে। ওবামা তার আত্মজীবনী ‘আ প্রমিজড ল্যান্ড’-এ লিখেছেন, সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনায় জারদারি ক্ষুব্ধ হতে পারেন ভেবে তিনি চিন্তিত ছিলেন। কিন্তু জারদারি তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন, ‘ফলাফল যা-ই হোক, এটি ভালো খবর।’ স্ত্রী বেনজির ভুট্টোর খুনিদের প্রধানের পতনে সেদিন জারদারি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন।
সেনাপ্রধানের স্নায়ুচাপ ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ অ্যাডমিরাল মাইক মুলেন যখন রাত ৩টায় জেনারেল কায়ানিকে অভিযানের খবর দেন, কায়ানি প্রথমবার কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়েন। বিশেষ করে ওসামা যে গত পাঁচ বছর ধরে সেনানিয়ন্ত্রিত ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ভেতরেই থাকছিলেন, তা ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্য চরম বিব্রতকর। সিআইএ প্রধান লিওন পানেটা সাফ জানিয়েছিলেন, বিশ্বাসঘাতকতার ভয়েই তারা পাকিস্তানকে এই অভিযানের কথা জানায়নি।
নীতিনির্ধারকদের বৈঠক ও ‘অযোগ্যতা’র বিতর্ক
সকাল ৭টায় যখন প্রধানমন্ত্রী, আইএসআই প্রধান এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কনফারেন্স রুমে ৯০ মিনিটের বৈঠকে বসেন, তখন সেখানে বিরাজ করছিল পিনপতন নীরবতা। ফারহাতুল্লাহ বাবর প্রেসিডেন্ট জারদারিকে সরাসরি বলেছিলেন, “এটি হয় যোগসাজশ, নতুবা চরম অযোগ্যতা।” সেনাবাহিনী ও আইএসআই-কে জবাবদিহিতার আওতায় আনার পরামর্শ দিলেও জারদারি তখন চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করেছিলেন।
ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা ও ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এ নিবন্ধ
ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর থেকেই শুরু হয় ড্যামেজ কন্ট্রোল। মে মাসের শেষে ওয়াশিংটন পোস্টে জারদারির নামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়, যেখানে দাবি করা হয় যে পাকিস্তানের সহযোগিতা ছাড়া এই অভিযান সফল হতো না। ফারহাতুল্লাহ বাবর মনে করেন, এই নিবন্ধটি ছিল একটি অযোগ্যতাকে রক্ষা করার ব্যর্থ চেষ্টা। এমনকি অ্যাবোটাবাদ কমিশনের রিপোর্ট তৈরি হলেও তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস তার বইয়ে লিখেছিলেন, পাকিস্তানের ১৫০ মাইল ভেতরে ঢুকে ক্যান্টনমেন্টের ভেতর থেকে ওসামাকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সুনামের ওপর এক বড় আঘাত। দিনশেষে, পাকিস্তান না পারল বীরত্ব দাবি করতে, না পারল নিজেদের গোয়েন্দা ব্যর্থতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে। ইতিহাসের সেই অধ্যায়টি আজও পাকিস্তানের কাছে এক অমীমাংসিত বিতর্কের নাম।