
সুন্দরবনের কাছাকাছি নির্মিত কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়নে সহায়তার অভিযোগে যুক্তরাজ্যের বার্কলেস ব্যাংকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আইনি অভিযোগ করা হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্যারাবন বা ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই না করেই ব্যাংকটি প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
যুক্তরাজ্য সরকারের ‘অফিস ফর রেসপন্সিবল বিজনেস কনডাক্ট’ বা ওআরবিসিতে এ অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে।
লন্ডনের কিংস লিগ্যাল ক্লিনিকের সহায়তায় তিন ব্যক্তি অভিযোগটি দায়ের করেন। অভিযোগকারীদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল, সুন্দরবন এলাকার কৃষক অনিমেষ মণ্ডল এবং স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি।
পরিবেশগত ঝুঁকি যাচাই না করার অভিযোগ
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব নীতিমালা অনুসরণের কথা বার্কলেসের, ব্যাংকটি তা লঙ্ঘন করেছে। পরিবেশের ওপর প্রকল্পটির সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব থাকা সত্ত্বেও অর্থায়নের আগে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করা হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রকল্প নামেও পরিচিত, ২০২২ সালে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তসংলগ্ন সুন্দরবনের ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকার কাছেই প্রকল্পটির অবস্থান।
প্রকল্পটির পরিকল্পনা ও নির্মাণপর্ব থেকেই এটি নিয়ে ব্যাপক বিরোধিতা ছিল। ইউনেসকোও বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বিরোধিতা করেছিল। পরিবেশগত, সামাজিক প্রভাব এবং সুশাসন বা ইএসজি নীতির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কয়েকটি ব্যাংক এই প্রকল্পে অর্থায়ন করতে রাজি হয়নি।
বার্কলেসের সঙ্গে এনটিপিসির আর্থিক সম্পর্ক
অভিযোগপত্রে ২০০৩ সাল থেকে বার্কলেসের পরিবেশসংক্রান্ত নীতিগুলোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। এসব নীতির মধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে তা সংশোধনের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন বা এনটিপিসির ১৭ কোটি ২৮ লাখ ইউরো মূল্যের শেয়ার ও বন্ডের অর্থায়নে সহায়তা করেছিল বার্কলেস। এনটিপিসি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি যৌথ অংশীদার।
এরপর ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের সময়কালে এনটিপিসির আরও ৬৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের শেয়ার ও বন্ডের অর্থায়নে সহায়তা করে বার্কলেস।
এ ছাড়া ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ভারতের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার বন্ড ইস্যুতেও অর্থায়নে সহায়তা করার কথা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। রামপাল প্রকল্পে এই ব্যাংকই ঋণ দিয়েছিল।
সুন্দরবনের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ
সুন্দরবন শুধু ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ নয়, উপকূলীয় মানুষের জন্য এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঢাল হিসেবেও কাজ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম ঝুঁকিতে থাকা এই বনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল রয়েছে।
কিংস লিগ্যাল ক্লিনিকের আইনজীবী সু উইলম্যান বলেন, জলবায়ু ও প্রকৃতির ওপর চলমান সংকটের মধ্যে সুন্দরবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য। যুক্তরাজ্যের ব্যাংকগুলোর কার্বন নিঃসরণকারী বিনিয়োগের বিষয়ে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার এটি একটি বড় সুযোগ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘একদিকে শূন্য কার্বনের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে দূষণকারী প্রকল্পে অর্থায়ন’
পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল অভিযোগ করেন, বার্কলেস ব্যাংক নিজেদের ওয়েবসাইটে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অথচ একই সময়ে সুন্দরবনের মতো পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় দূষণ সৃষ্টিকারী প্রকল্পে অর্থায়নে সহায়তা করছে।
শরীফ জামিল বলেন, বার্কলেসকে ওইসিডির প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যেই তিনি এই অভিযোগ করেছেন। ব্যাংকটির বিনিয়োগের কারণে এখনো যে ক্ষতি হচ্ছে, সেটি নিয়েও আলোচনায় বসতে চান বলে জানান তিনি।