
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে চীনের বাড়তে থাকা প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কথা জানালেন বাংলাদেশে নবনিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, অংশীদার দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতার প্রয়োজন মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে একাধিক বিকল্প রয়েছে।
মঙ্গলবার (২১ জানুয়ারি) এক মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন বলেন, ‘আমার শুনানিতে যেমনটি বলেছি, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বিস্তৃত প্রভাব নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার খুব স্পষ্ট অবস্থানও নিয়েছে। শুনানিতে আমি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সে অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকার হোক বা নবনির্বাচিত সরকার- সরকারের বন্ধুদের সঙ্গে আমি সবসময় যোগাযোগ রাখব এবং বাংলাদেশ সরকার যদি কোনো ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়; তাহলে সেসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরব।’
তিনি জানান, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক পর্যায়ের সহযোগিতা বর্তমানে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং সময়ের সঙ্গে তা আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। নৌবাহিনীর সঙ্গে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার, সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন কার্যক্রম এবং বিমানবাহিনীর সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও মহড়ার মাধ্যমে অপারেশনাল সক্ষমতা ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার দক্ষতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে।
ক্রিস্টেনসেন আরও বলেন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ভূমিকা বিস্তৃত করা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রস্তুতি জোরদারের অংশ হিসেবে দেশটির সামরিক আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা উন্নয়ন পরিকল্পনায়ও যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, ওয়াশিংটনে তার আগের দায়িত্ব এবং বাংলাদেশে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে নিরাপত্তা ইস্যু তার কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকায় অবস্থিত চীন দূতাবাস। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দূতাবাসের মুখপাত্র এসব মন্তব্যকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, এতে ‘ভুল-শুদ্ধ’ গুলিয়ে ফেলা হয়েছে এবং এর পেছনে স্পষ্টভাবে ‘অসৎ উদ্দেশ্য’ রয়েছে।
চীন দূতাবাসের মুখপাত্র আরও বলেন, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের এ ধরনের মন্তব্য দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর গত ৫০ বছরে চীন ও বাংলাদেশ পারস্পরিক সমর্থন ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতায় যুক্ত রয়েছে। এই সহযোগিতা দুই দেশের জনগণের জন্য বাস্তব সুফল এনেছে এবং ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা আঞ্চলিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
চীনের মুখপাত্র বলেন, ‘চীন ও বাংলাদেশের সহযোগিতা দুই দেশ ও তাদের জনগণের বিষয়। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কিংবা আঙুল তোলার কোনো সুযোগ নেই। আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানাই এবং বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক উন্নয়ন ও সহযোগিতার পক্ষে সহায়ক এমন কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগ দেওয়ার তাগিদ দিতে চাই।’
প্রসঙ্গত, রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনয়ন শুনানির সময় নেব্রাস্কার সিনেটর পিট রিকেটস বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। জবাবে ক্রিস্টেনসেন তখনও দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব নিয়ে তার উদ্বেগের কথা জানান। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বাংলাদেশ সরকার ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে বিশেষ করে সামুদ্রিক খাত ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে চীনের কার্যক্রমের সম্ভাব্য ঝুঁকি তুলে ধরবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতার সুযোগ ও সম্ভাব্য সুফল ব্যাখ্যা করার কথাও বলেন তিনি।