
দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বাড়লেও চিকিৎসার আওতায় আসছেন না আক্রান্তদের বড় অংশ। সর্বশেষ জাতীয় জরিপের পর করোনা মহামারি, অর্থনৈতিক সংকট ও ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মতো বড় পরিবর্তন ঘটলেও দেশের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির হালনাগাদ চিত্র জানতে নতুন কোনো জাতীয় জরিপ হয়নি। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ মানসিক রোগে আক্রান্ত। তবে জরিপের আরেকটি হিসাবে প্রাপ্তবয়স্কদের আক্রান্তের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন রয়েছে এমন মানুষের সংখ্যা তিন কোটির বেশি।
চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। জরিপ অনুযায়ী, মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশুদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো ধরনের সেবা নেন না। গত জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. শাখাওয়াত হোসেন বকুলও স্বীকার করেন, আক্রান্তদের ৯২ শতাংশের বেশি চিকিৎসার বাইরে থাকেন।
বিশেষজ্ঞ ও জনবলের সংকট
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য অ্যাটলাস ২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন মাত্র শূন্য দশমিক ০৭৩ জন এবং মনোবিজ্ঞানী শূন্য দশমিক ১২ জন। সব মিলিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা প্রতি লাখে ১ দশমিক ১৭ জন।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টের সদস্যসচিব অধ্যাপক ডা. মো. নিজাম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চাহিদার তুলনায় দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অনেক পিছিয়ে। সচেতনতার অভাব বড় বাধা। অনেকে মানসিক অসুস্থতাকে গুরুতর সামাজিক কলঙ্ক হিসেবে দেখেন, ফলে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হন না।
তিনি বলেন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে তিন কোটির বেশি মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। অথচ বিশেষজ্ঞ মনোরোগ চিকিৎসকের সংখ্যা আনুমানিক ২৫০ থেকে ৪০০ জন। এতে চিকিৎসার বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। প্রতি ১০০ জন আক্রান্ত মানুষের মধ্যে মাত্র আটজন সেবা নিতে আসেন; বাকিরা চিকিৎসার বাইরে থেকে যান। কেউ কেউ অপচিকিৎসার শিকার হন, আবার অনেকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিনের মতে, জনসচেতনতার অভাব, দক্ষ জনবলের সংকট, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি ও সীমিত বাজেট—এই চারটি বিষয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে বড় বাধা। বর্তমানে সেবার বড় অংশ ঢাকা ও বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক; জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সেবা এখনও পর্যাপ্ত নয়।
স্বাস্থ্য বাজেটে বরাদ্দ মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা অর্থের সংকট। স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়। পর্যাপ্ত অর্থায়ন ছাড়া দক্ষ জনবল নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছানো কঠিন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিষণ্ণতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যাসহ মানসিক রোগ মানুষের দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা হারানোর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠছে। ফলে মানসিক স্বাস্থ্য এখন শুধু ব্যক্তিগত চিকিৎসার বিষয় নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ।
সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ২০২৫ সালে ২০ হাজারের বেশি মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শসেবা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণের কাজ চলছে।
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন বলেন, সরকার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে। সেখানে মানসিক স্বাস্থ্য কর্নার চালু করা হলে সেবার পরিধি বাড়তে পারে। তবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিতে আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে নতুন জাতীয় জরিপ অত্যন্ত জরুরি। যত দ্রুত সম্ভব এ জরিপের কাজ শুরু করা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করে কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া যায়।