
সীমান্তের উত্তেজনা প্রশমন এবং দ্বিপাক্ষিক নানা জটিলতা নিরসনে ভারতের রাজধানীতে মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। মঙ্গলবার জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত সম্মেলন।
এদিন বেলা ১১টায় দুই দেশের প্রতিনিধিদের যৌথ ফটোসেশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকের মূল পর্ব শুরু হয়। এর আগে গত সোমবার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি দল দিল্লিতে পৌঁছায়। অন্যদিকে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) প্রধান প্রবীণ কুমারের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধি দল এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে।
বৈঠকের শুরুতেই বিজিবি প্রধান মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বর্তমান সীমান্ত পরিস্থিতি এবং এর টেকসই সমাধান নিয়ে বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি সম্প্রতি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে পুশইনের (জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া) চেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং এর ফলে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশি নাগরিকদের মাঝে সৃষ্ট সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। সীমান্ত হত্যা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি এই হার শূন্যে নামিয়ে আনতে দুই দেশকে আরও আন্তরিকভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার সীমান্তে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অতীতে দুই বাহিনীর সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী দুই দেশের শক্রু। অপরাধীদের কোনো দেশ নেই।’
এরপর বিজিবির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) বাংলাদেশের পক্ষে মূল এজেন্ডাগুলো পেশ করেন। সীমান্তে প্রাণঘাতী নয় (নন-ল্যাথাল) এমন অস্ত্র ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও বেসামরিক নাগরিকদের গুলি করে হত্যার কঠোর সমালোচনা করা হয়। এছাড়া পুশইন বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো, ভারত থেকে বাংলাদেশে মাদক, অস্ত্র ও নিষিদ্ধ পণ্যের চোরাচালান বন্ধ এবং মানবপাচার রোধে জোরালো দাবি জানানো হয়।
বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে বিএসএফের কাঁটাতারের বেড়াসহ যেকোনো অননুমোদিত স্থাপনা নির্মাণ বন্ধের দাবি তোলে। বিশেষ করে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে ভারতের পক্ষ থেকে জিরোলাইনের ১৫০ গজের ভেতর অবৈধভাবে স্থাপনা তৈরির চেষ্টার বিষয়টি তুলে ধরে ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক সীমান্ত চুক্তি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে তিনবিঘা করিডোর দিয়ে দহগ্রাম পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপন, আখাউড়া-আগরতলা সীমান্তের খালের বর্জ্য অপসারণে ইটিপি বসানো, মুহুরীর চরে স্থায়ী সীমানা পিলার নির্মাণ এবং আন্তঃসীমান্ত নদীর তীর সংরক্ষণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এছাড়াও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর তালিকা হস্তান্তর, আকাশসীমা লঙ্ঘন করে ড্রোন ও হেলিকপ্টার ওড়ানো বন্ধ এবং ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে অপপ্রচার বন্ধের এজেন্ডা উত্থাপন করে বিজিবি।
অন্যদিকে, বিএসএফের পক্ষ থেকেও বেশ কিছু পাল্টা এজেন্ডা ও অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। তাদের দাবি, ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে গত ৬ মাসে বাংলাদেশি নাগরিকদের হামলায় একাধিক বিএসএফ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। তারা বাংলাদেশি নাগরিকদের দ্বারা বিএসএফ ও ভারতীয় বেসামরিকদের ওপর হামলা এবং ওপার থেকে ভারতে গিয়ে চুরি-ডাকাতি বন্ধের প্রস্তাব দেয়।
পাশাপাশি বিজিবির আপত্তির কারণে ভারতীয় সীমান্তে যেসব উন্নয়নমূলক কাজ আটকে আছে, তা পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশের সহযোগিতা কামনা করে বিএসএফ। ভারতের অভ্যন্তরীণ অপরাধী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং দুই বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস পুনর্গঠনের ওপর জোর দিয়ে নিজেদের বক্তব্য শেষ করে ভারতীয় পক্ষ।