
বাহরাইনের ইতিহাসে শিয়া ধর্মীয় নেতাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় গণবিচারের আয়োজন করতে যাচ্ছে দেশটির সরকার। এই বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিযুক্তদের কাছ থেকে নির্যাতন ও জোরজবরদস্তির মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ তুলেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। তাদের দাবি, আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে।
রোববার বাহরাইনের একটি আদালতে ৬৯ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করার কথা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৬০ জনই শিয়া ধর্মীয় নেতা। তাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য হওয়া, দেশের ‘সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা’ উৎখাতের চেষ্টা এবং ইরানের রাজনৈতিক আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
বাহরাইন ইনস্টিটিউট ফর রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (বিআইআরডি) বিভিন্ন অভিযুক্তের কাছ থেকে পাওয়া জবানবন্দি পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, আটকের পর তাঁদের নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রাখা, টানা অনেকক্ষণ চোখ বেঁধে ও হাতকড়া পরিয়ে রাখা, ঘুমাতে না দেওয়া এবং শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের হুমকি। শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তিরাই নন, তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও নির্যাতনের ভয় দেখানো হয়েছে।
এ ছাড়া অভিযুক্তদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
৬২ বছর বয়সী ধর্মীয় নেতা শেখ মোহাম্মদ সাঈদ আল-তাইতুন তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, তাঁকে এক সপ্তাহ ধরে চোখ বেঁধে ও হাতকড়া পরিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল। প্রস্রাবের সঙ্গে প্রচুর রক্ত যাওয়ার পাশাপাশি কিডনিতে পাথর থাকা সত্ত্বেও তাঁকে দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এমনকি প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের সুযোগও দেওয়া হয়নি।
আরেক অভিযুক্ত ৫৭ বছর বয়সী সাইয়েদ মুসা জাওয়াদ আলওয়েদাই তদন্তকারীদের কাছে অভিযোগ করেছেন, তাঁকে মারধর করা হয়েছে, বিদ্যুতের শক দিয়ে নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং একপর্যায়ে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় রাখা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ ২০টি মানবাধিকার সংগঠন বাহরাইন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন নির্বিচারে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া হয় এবং শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করা হয়। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তিদের ওপর নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংগঠনগুলো।
ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা
২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় বাহরাইনে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশটির সরকারের দমন-পীড়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বারবার সমালোচনা হয়েছে।
দেশটির ক্ষমতাসীন সুন্নি রাজতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতাদের লক্ষ্যবস্তু করে আসছে। প্রায়ই তাঁদের বিরুদ্ধে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বা দেশটির ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়।
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া দেশগুলোর মধ্যে বাহরাইনও রয়েছে। এর পর থেকে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে সন্দেহ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বাহরাইন সরকার আরও কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।
এদিকে ইরানি বংশোদ্ভূত বাহরাইনের ৬৯ জন নাগরিকের নাগরিকত্বও বাতিল করা হয়েছে।
দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থার প্রধান তারিক আল হাসান শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যকে বাহরাইনের সার্বভৌম কর্তৃত্বের ওপরে স্থান দেয়—এমন একটি আদর্শের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই এই অভিযান চালানো হচ্ছে।
তবে সরকারের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন সমালোচকেরা। তাঁদের মতে, দেশটির ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ করার প্রচেষ্টারই আরেকটি ধাপ হচ্ছে এই দমন অভিযান।
বাহরাইন ইনস্টিটিউট ফর রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (বিআইআরডি) অ্যাডভোকেসি পরিচালক সাইয়েদ আহমেদ আলওয়াদাই এই বিচারপ্রক্রিয়াকে বাহরাইনের শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস ও পরিচয়ের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, ২০১১ সালের পর থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর চালানো নিপীড়নের সবচেয়ে নৃশংস দৃষ্টান্তগুলোর একটি এই বিচার।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, নির্যাতনের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাঁদের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণের যথাযথ বিরোধিতা বা সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার কার্যকর সুযোগ পাচ্ছেন না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিচারব্যবস্থা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পরিবর্তে নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
তিনি আরও বলেন, ন্যায়বিচারের নামে এমন প্রহসন বন্ধ করতে হবে। এ ঘটনা বাহরাইনের মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করবে এবং দেশটির ভেতরে বিভেদ আরও বাড়িয়ে তুলবে।
সূত্র: মিডিল ইস্ট আই