
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হজরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন দিঘি থেকে মিঠাপানির কুমির সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনার পর প্রশাসনের সিদ্ধান্তে কুমিরটি সরানো হলেও এবার সেটি ফেরত চেয়ে দাবি তুলেছেন মাজারের প্রধান খাদেম।
তিন দিন আগে কুমিরের আক্রমণে এক শিশুর মৃত্যু হলে প্রশাসন ও বন বিভাগ নিরাপত্তার স্বার্থে কুমিরটি সরানোর সিদ্ধান্ত নেয়। মঙ্গলবার (২ জুন) রাতে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর বুধবার (৩ জুন) বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে কুমিরটিকে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।
কুমির সরানোর পর থেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম। তিনি দাবি করেন, মাজারের দিঘি ও কুমির দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সংরক্ষিত। তিনি বলেন, ‘খানজাহান আলী (রহ.)–এর মাজার এবং এই দিঘি সাড়ে ৫০০ বছর ধরে আমাদের পরিবার ও আমরা দেখভাল করে আসছি। হ্যাঁ, আমাদের ভুলত্রুটি থাকতে পারে। এটা বাগেরহাটের মানুষের একটি সম্পদ। দুর্ঘটনা যেকোনো জায়গায় হতে পারে। তাই বলে কুমিরটি নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি।’
তিনি আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাগেরহাট থানায় যদি কোনো লোক মারা যায়, তাহলে কি ওসির চাকরি চলে যাবে? থানা বন্ধ করে দিতে হবে, এমন কোনো নিয়ম আছে নাকি?’
খাদেম আরও বলেন, দর্শনার্থীদের কাছে কুমিরটি একটি আকর্ষণ ছিল। এটিকে ফিরিয়ে এনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে পুনরায় দিঘিতে রাখার দাবি জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘কুমিরকে অনতিবিলম্বে এখানে দেওয়া হোক। এর নিরাপত্তার জন্য ব্যবস্থা হোক। আমরা প্রশাসনের সহযোগিতা নেব।’
তবে এ ঘটনায় ভিন্নমতও রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে কুমির সরানোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন অনেক দর্শনার্থী। মোল্লাহাট থেকে আসা দর্শনার্থী শাহিদা বেগম বলেন, কোনো প্রাণহানি কাম্য নয়। তবে উপযুক্ত বেষ্টনী তৈরি করে কুমিরটিকে আবার প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএন ২০০০ সালে মিঠাপানির কুমিরকে বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিল। মাজারের দিঘির কুমিরগুলো ছিল এই মিঠাপানির কুমির প্রজাতির।
এ বিষয়ে করমজল বন্যপ্রাণী ও কুমির প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, সুন্দরবনে কুমির প্রজনন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রশাসন চাইলে দিঘির এক পাশে কুমির প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তবে তিনি জানান, বিভিন্ন নদ-নদী থেকে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি মিঠাপানির কুমির উদ্ধার করা হয়েছে, বিষয়টি বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।
খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল বলেন, লোনাপানির সুন্দরবনে মিঠাপানির কুমির ছেড়ে দিলে তা বাঁচবে না। তাই উপযুক্ত পরিবেশেই প্রাণী ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কুমিরটির ভবিষ্যৎ স্থান নির্ধারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা হবে বলেও তিনি জানান।
বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, কুমিরটির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে পরে জানানো হবে।