
টানা আট দিনের প্রলয়ংকরী বর্ষণ আর উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলের তাণ্ডব শেষে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে শুরু করেছে।
গত রবিবার রাত ও সোমবার সকাল থেকে নতুন করে বৃষ্টি না হওয়ায় প্লাবিত জনপদগুলো থেকে নামতে শুরু করেছে পানি। তবে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গেই উন্মোচিত হচ্ছে ধ্বংসলীলার এক হাড়হিম করা বাস্তব চিত্র। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ তালিকায় উঠে এসেছে ব্যাপক প্রাণহানি, ঘরবাড়ি ধ্বংস, মৎস্য ও কৃষির অপূরণীয় ক্ষতি এবং অবকাঠামো ভেঙে পড়ার এক হৃদয়বিদারক খতিয়ান। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পানি সম্পূর্ণ নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির এই ক্ষত আরও স্পষ্ট ও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান, গত ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা নয় দিনে কক্সবাজারে মোট ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। তবে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ৪ মিলিমিটার।
ডুবল অর্ধেক জেলা, পানিবন্দি আড়াই লাখ মানুষ
জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি এবং ৫টি পৌরসভার মধ্যে ৪টিই প্লাবিত হয়েছিল। সব মিলিয়ে জেলার প্রায় ৪৯ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং আড়াই লাখের বেশি মানুষ চরম পানিবন্দি অবস্থায় পড়েন।
উপজেলাভিত্তিক প্লাবিত এলাকার চিত্র ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ:
পেকুয়া: উপজেলার ৯৫ শতাংশ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত হয়।
মাতামুহুরী: ৮৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়।
চকরিয়া: ৮০ শতাংশ এলাকা তলিয়ে যায়।
কুতুবদিয়া ও মহেশখালী: যথাক্রমে ৬৫ ও ৫০ শতাংশ এলাকা জলমগ্ন হয়।
রামু, কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ ও ঈদগাঁও: রামুতে ৩৫ শতাংশ, উখিয়া-টেকনাফ ও সদরে ২৫ শতাংশ এবং ঈদগাঁওয়ে ৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়।
পাহাড় ধস ও বন্যায় ৩২ প্রাণহানি, রোহিঙ্গা শিবিরে ট্র্যাজেডি
ভারী বর্ষণ ও পাহাড় ধসে এ পর্যন্ত ১৩ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ৩২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। উখিয়া উপজেলায় পাহাড় ধসে ১৩ জন রোহিঙ্গাসহ ১৪ জন মারা যান। চকরিয়ায় প্রাণ হারিয়েছেন ছয়জন এবং এখনও একজন নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়া সদরে ৩ জন, পেকুয়ায় ২ জন, রামুতে ৩ জন এবং মাতামুহুরী, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় ১ জন করে মারা গেছেন।
পাশাপাশি ঝড়-বন্যায় জেলার ১ হাজার ৬১৩টি ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে। ঘরবাড়ি হারানোর তালিকায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পেকুয়া (৪৫০টি) ও চকরিয়া (৩০০টি)।
বিলীন কোটি কোটি টাকার মাছ ও ফসল
বন্যার করাল গ্রাসে জেলার মৎস্য ও কৃষি খাত প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
মৎস্য খাতের বিপর্যয়: জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায় জেলার ১০ উপজেলার ৬১টি ইউনিয়নের ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ৪৫৩টি চিংড়িঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মোট আয়তন প্রায় ২ হাজার ৪৪০ হেক্টর। তিনি আরও বলেন,
"এসব পুকুর ও ঘের থেকে এক হাজার ৯৭ টন মাছ, ৩৮৫ টন চিংড়ি, ৩ কোটি ৫৬ লাখ মাছের পোনা এবং ২ কোটি ২১ লাখ চিংড়ির পোনা নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি ৭৬৮টি পুকুর, ঘের ও খামারের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।"
কৃষির অপূরণীয় ক্ষতি: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, ৪ হাজার ২১১ হেক্টর জমির আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পানবরজ ও শাকসবজি নষ্ট হয়ে গেছে। এর ফলে ৯টি উপজেলার ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যার মধ্যে চকরিয়াতেই রয়েছেন সর্বোচ্চ ১৩ হাজার ৮৫২ জন চাষি। কক্সবাজারের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক বলেন,
"এটি প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব। বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে গেলে মাঠপর্যায়ে যাচাই শেষে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।"
ভেঙে পড়েছে সড়ক, সেতু ও বেড়িবাঁধ
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যমতে, বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় ৪৪টি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন,
"চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্বপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ও একটি সেতুর অংশ ভেঙে গেছে। বৃষ্টি কমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো দ্রুত মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।"
এছাড়া, ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভেঙেছে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়াতে। কুতুবদিয়া ও পেকুয়াতে ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যও মিলেছে।
দুর্গত এলাকায় ত্রাণ অপর্যাপ্ত, পানির তীব্র সংকট
টানা ৯ দিনে জেলার ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১ হাজার ৫৮০ জন মানুষ। সরকারিভাবে ২৯৮ টন চাল ও ৭,৭৯০ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হলেও ভুক্তভোগীদের দাবি—সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। বিশেষ করে খাবার পানি ও রান্নার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। নলকূপগুলো পানির নিচে তলিয়ে থাকায় সুপেয় পানির জন্য হাহাকার করছেন বানভাসি মানুষ।
দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিমন্ত্রীর আশ্বাস
দুর্যোগ পরিস্থিতি সশরীরে তদারকি করতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হয়ে কক্সবাজার সফর করছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য অমিত। সোমবার রাতে জেলা প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন,
"বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি মানুষের পাশে সরকার রয়েছে। যে যেভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের কাছে দ্রুত সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেয়া হবে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে নেয়া হবে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ।"
তিনি আরও জানান:
"প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়ে তাকে কক্সবাজারে পাঠিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা হলো, কোনো মানুষ যেন অনাহারে না থাকে এবং কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার যেন সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়। আমরা শুধু কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চাই যে সরকার মানুষের পাশে রয়েছে।"
দুর্গম অঞ্চলের ত্রাণ পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন:
"অনেক দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সব জায়গায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে প্রশাসনের সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব এলাকায়ও দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যেখানে জেলা প্রশাসনের পক্ষে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, নৌবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী কাজ করছে। আমাদের লক্ষ্য প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।"
জেলা প্রশাসক এম এ মান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ, জেলা পরিষদের প্রশাসক নুরুল বশর চৌধুরীসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।