
বছরে প্রায় ৩৯ কোটি ২৫ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ হারাচ্ছে নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (নেসকো)। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম লসের পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৭২ শতাংশ। ২০২৪ সালের নির্ধারিত প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সা পাইকারি মূল্য ধরে হিসাব করলে হারানো বিদ্যুতের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২৭৬ কোটি টাকা। তবে এই ক্ষতির আর্থিক প্রভাব এবং সিস্টেম লসের মধ্যে কারিগরি ও বাণিজ্যিক ক্ষতির পৃথক হিসাব পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, সাত বছরে সিস্টেম লস কমলেও রাজশাহীর তুলনায় রংপুর অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে লোকসান ও গ্রাহকের বকেয়া বেশি রয়েছে।
নেসকোর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের হিসাব, সাত বছরের সিস্টেম লস ও রাজস্ব আদায়ের তুলনামূলক তথ্য এবং প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বা কেনার পর গ্রাহকের কাছে সরবরাহ করা বিদ্যুতের যে অংশ বিক্রির হিসাবে আসে না, তাকে সিস্টেম লস বলা হয়। বিদ্যুৎ লাইনের কারিগরি ক্ষতির পাশাপাশি মিটারিং, বিলিং ও অবৈধ সংযোগের মতো বাণিজ্যিক কারণেও এ ধরনের ক্ষতি হতে পারে। নেসকোর হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৫০৮ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ গ্রহণের বিপরীতে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৪৬৯ কোটি ইউনিট। ফলে প্রায় ৩৯ কোটি ২৫ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ সিস্টেম লসের হিসাবে চলে গেছে।
রংপুরে লোকসান ও বকেয়া বেশি
নেসকোর রাজশাহী ও রংপুর জোনের সাত বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিটি অর্থবছরেই রংপুরে সিস্টেম লসের হার রাজশাহীর চেয়ে বেশি ছিল।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজশাহী জোনে সিস্টেম লস ছিল ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ, রংপুরে ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ওই বছর রাজশাহীতে গড় বকেয়া ছিল ২ দশমিক ৪৮ মাসের বিল, রংপুরে ৪ দশমিক ৭৫ মাস।
পরবর্তী বছরগুলোতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাজশাহীতে সিস্টেম লস ছিল ১০ শতাংশ, রংপুরে ১২ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা যথাক্রমে ৯ দশমিক ১৯ ও ১২ দশমিক ৩৯ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে রাজশাহীতে সিস্টেম লস ছিল ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ, রংপুরে ১০ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজশাহী ও রংপুরে সিস্টেম লস ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ৬১ ও ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৭ দশমিক ৩২ ও ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশে।
সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহীতে সিস্টেম লস কমে ৬ দশমিক ৯৯ শতাংশে নেমেছে। রংপুরে তা ছিল ৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। সাত বছরে রাজশাহীতে সিস্টেম লস কমেছে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ পয়েন্ট, রংপুরে কমেছে ৫ দশমিক ১৮ শতাংশ পয়েন্ট।
সিস্টেম লসের পাশাপাশি গ্রাহকের বিল বকেয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে রয়েছে রংপুর। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহী জোনে গড় বকেয়া ছিল ১ দশমিক ৬৭ মাসের বিল। রংপুরে তা ছিল ৩ দশমিক ৫১ মাস।
প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের প্রতিবেদনে তদারকির সুপারিশ
নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনেও দুই অঞ্চলের এ পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রংপুর জোনে সিস্টেম লস রাজশাহীর তুলনায় গড়ে ২ থেকে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে বকেয়ার পরিমাণও প্রায় দুই মাস বেশি।
এ পরিস্থিতিতে রংপুর অঞ্চলের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে আরও নিবিড় তদারকির প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বগুড়ায় প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হলে রাজশাহী ও রংপুর—দুই অঞ্চলের কার্যক্রম তদারকি সহজ হবে। এতে সিস্টেম লস কমানোর পাশাপাশি রাজস্ব আদায় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মত দেওয়া হয়েছে।
চাহিদা মেটাতে বাড়ছে চাপ
সিস্টেম লসের প্রভাব শুধু বিতরণ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন বা কিনে বিতরণ ব্যবস্থার ক্ষতি কমানো গেলে গ্রাহকের কাছে বেশি বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব। এতে বাড়তি উৎপাদনের প্রয়োজনও কমতে পারে।
বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিতরণ ব্যবস্থায় ক্ষতি কমানো জরুরি। সিস্টেম লস কমানো গেলে একই পরিমাণ উৎপাদন থেকে গ্রাহকের কাছে বেশি বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে অতিরিক্ত উৎপাদনের ওপর চাপ কমবে।
ক্ষতির পূর্ণ হিসাব কোথায়?
নেসকোর হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৩৯ কোটি ২৫ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ সিস্টেম লস হয়েছে। তবে এই বিদ্যুতের আর্থিক মূল্য এবং ক্ষতির ধরন অনুযায়ী পৃথক হিসাব সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ফলে সিস্টেম লসের কারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি কত, তা সরাসরি নির্ধারণ করা যায়নি।
একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিদ্যুতের প্রতিটি ইউনিট উৎপাদন বা কেনার সঙ্গে ব্যয় জড়িত। সেই বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা না গেলে প্রত্যাশিত রাজস্বও পাওয়া যায় না। তাই সিস্টেম লস কমানো গেলে একদিকে বিতরণ ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়, অন্যদিকে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ থেকে বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়।
নেসকোর সাত বছরের তথ্যে সিস্টেম লসের হার ধারাবাহিকভাবে কমার চিত্র পাওয়া গেলেও সর্বশেষ অর্থবছরেও বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে ক্ষতির পূর্ণ হিসাব নিরূপণ এবং বাণিজ্যিক লোকসান কমাতে কার্যকর তদারকি জোরদারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, রাজশাহী অঞ্চলে নিয়মিত ও নিবিড় তদারকির কারণে সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে বিতরণ লাইন ও অবকাঠামো তদারকি, ত্রুটি শনাক্ত করে দ্রুত মেরামত এবং বিতরণ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। রংপুর অঞ্চলে এ ধরনের কার্যক্রম আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।