
সরকারি চাকুরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের নেপথ্যে থাকা একটি শক্তিশালী ও সুসংবদ্ধ সিন্ডিকেটের অবিশ্বাস্য কর্মকাণ্ডের হাড়হিম করা বিবরণ উঠে এসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে। মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (চার্জশিট) অনুযায়ী, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) অধীনে অনুষ্ঠিত বিসিএসসহ বিভিন্ন নন-ক্যাডার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পরীক্ষার আগেই নিখুঁতভাবে সরিয়ে ফেলা হতো। এরপর বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তা নির্দিষ্ট চাকরিপ্রত্যাশীদের হাতে তুলে দিয়ে অবৈধভাবে সরকারি চাকুরির ব্যবস্থা করে দিত এই চক্র।
গোয়েন্দা তদন্তে জানা গেছে, পুরো চক্রটি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট স্তরে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করত। প্রথম ধাপে মাঠপর্যায়ের দালালরা এমন সব সচ্ছল চাকরিপ্রত্যাশীদের খুঁজে বের করত, যারা যেকোনো মূল্যে সরকারি চাকুরি পেতে ব্যাকুল। এরপর পদের গুরুত্ব ও পরীক্ষার ধরন বুঝে প্রার্থীদের সঙ্গে কয়েক লাখ টাকার চুক্তি করা হতো।
পরের ধাপে চলত মূল প্রশ্নপত্র সংগ্রহের দুঃসাহসিক মিশন। প্রশ্ন মুদ্রণ ও প্যাকেজিংয়ের মতো অতি সংবেদনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মচারীদের হাত করে পরীক্ষার মূল কপি বাইরে আনা হতো। প্রশ্ন ফাঁসের পর সুনির্দিষ্ট প্রার্থীদের পরীক্ষার দু-একদিন আগেই ঢাকায় এনে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও নিরাপদ গোপন ডেরায় রাখা হতো। সেখানে পরীক্ষার আগের রাতে প্রার্থীদের হাতে প্রশ্ন ও তার তৈরি করা উত্তরপত্র তুলে দেওয়া হতো। এমনকি প্রার্থীদের উত্তর মুখস্থ করানোর জন্য একটি বিশেষ তদারকি বা ‘কোচিং’ দলও সার্বক্ষণিক কাজ করত।
তদন্তকারী সংস্থার বর্ণনা মতে, পরীক্ষার দিন ভোরবেলা কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে পরীক্ষার্থীদের নিজ নিজ কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হতো। পুরো প্রক্রিয়াটি এতই স্তরভিত্তিক ও নিখুঁত ছিল যে, চক্রের এক স্তরের সদস্য অন্য স্তরের কাজ সম্পর্কে কিছুই জানত না। ফলে এই সিন্ডিকেটের মূল মাথাদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দাদের দীর্ঘ সময় ধরে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হয়েছে।
দাখিল করা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, এই চক্রের নেটওয়ার্ক দেশের বিভিন্ন জেলায় মাকড়সার জালের মতো বিস্তৃত ছিল। এর সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা, পিএসসির বর্তমান ও সাবেক কর্মচারী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসা খাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যুক্ত ছিলেন। এই অপরাধের রুট বিজি প্রেস (সরকারি মুদ্রণালয়) থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত ছড়ানো ছিল।
তদন্তে বিশেষভাবে উঠে এসেছে বিজি প্রেসে কর্মরত মোহাম্মদ আকরাম হোসেন মন্ডলের নাম, যিনি প্রশ্নপত্র প্যাকেজিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন। আদালতে দেওয়া নিজের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি প্রশ্ন চুরির রোমহর্ষক কৌশল ফাঁস করেছেন। জবানবন্দি অনুযায়ী, তিনি কখনো কখনো প্রশ্নপত্র কৌশলে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে নিজের মোবাইল ফোনে ছবি তুলে রাখতেন এবং প্রমাণ নষ্ট করতে মূল কাগজটি কমোডে ফ্লাশ করে দিতেন। আবার কখনো বা পুরো প্রশ্নপত্রটি নিজের অন্তর্বাসের (আন্ডারওয়্যার) ভেতর লুকিয়ে অত্যন্ত নিরাপদে বিজি প্রেসের বাইরে নিয়ে আসতেন।
পরবর্তী সময়ে বিজি প্রেসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মজনু মিয়াও এই লাভজনক অপরাধের বৃত্তে জড়িয়ে পড়েন। তারা দুজন মিলে বিভিন্ন চাকুরির পরীক্ষার সব সেটের প্রশ্ন সংগ্রহ করে চক্রের অন্য সদস্যদের সরবরাহ করতেন। সিআইডির (কআইডি) মতে, বিজি প্রেস থেকে প্রশ্ন বাইরে বের করে আনার এই প্রাথমিক ধাপটিই ছিল পুরো চক্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশ।
তদন্তকারীরা মোহাম্মদপুরের দুটি নির্দিষ্ট আবাসনকেন্দ্র বা সেফ হাউজের সন্ধান পেয়েছেন, যেখানে পরীক্ষার্থীদের বন্দিশালায় রাখার মতো করে আটকে রাখা হতো। মামলার পলাতক আসামি আল মামুন ‘ইউএসটি’ ও ‘পদক্ষেপ’ নামের দুটি এনজিওর নামে আবাসন ভাড়া নিয়ে পরীক্ষার দুই দিন আগেই পরীক্ষার্থীদের সেখানে এনে তুলতেন।
অভিযান চালিয়ে জব্দ করা রেজিস্টার খাতা, মানি রিসিট, ব্যাংক স্লিপ ও অন্যান্য নথিপত্র ঘেঁটে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, ওই সেফ হাউজগুলোতে পরীক্ষার্থীদের রাজকীয় খাওয়া-দাওয়া এবং প্রশ্ন-উত্তর মুখস্থ করানোর সব ব্যবস্থা ছিল। কেবল একটি নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করেই পরীক্ষার্থীদের থাকা ও খাওয়ার পেছনে ৪ লাখ ১৬ হাজার ১২২ টাকা ব্যয়ের হিসাব পাওয়া গেছে। এছাড়া অন্য একটি লেনদেনে সরাসরি ৫০ হাজার টাকা হাতবদল হওয়ার তথ্য-প্রমাণ মিলেছে।
সিআইডি জানিয়েছে, ৪৬তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষাসহ সাম্প্রতিক সময়ের বেশ কয়েকটি বড় নিয়োগ পরীক্ষায় হুবহু একই ছক ও কৌশল খাটানো হয়েছিল। পরীক্ষার্থীদের গোপন আস্তানায় জড়ো করা, প্রশ্ন সরবরাহ এবং পরীক্ষার আগে প্রস্তুত করার বিষয়ে সব ধরনের অকাট্য তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ সিআইডির হাতে এসেছে।
এই প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে সরাসরি ৫৫ জনের নাম দালিলিক প্রমাণসহ উঠে এলেও পুরো নেটওয়ার্কের মূল চাবিকাঠি বা কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী জীবন। অভিযোগ অনুযায়ী, মাঠপর্যায় থেকে বিত্তবান প্রার্থী সংগ্রহ, কোটি কোটি টাকার লেনদেন ও অর্থ বণ্টন এবং প্রশ্ন পৌঁছে দেওয়ার পুরো সিন্ডিকেটটি মূলত তিনিই নিয়ন্ত্রণ করতেন।
তদন্ত সংস্থার দাবি, প্রশ্নফাঁসের এই কালো টাকা দিয়ে চালক আবেদ আলী ও তার সহযোগীরা ঢাকা ও ঢাকার বাইরে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ জমি, বিলাসবহুল বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। বর্তমানে তাদের এই বিপুল অবৈধ সম্পদের উৎস এবং কোটি কোটি টাকার ব্যাংকিং লেনদেনের বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আদালতে পেশ করা চার্জশিটে বলা হয়েছে, প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা বৈধ ব্যবসায় রূপান্তর বা স্থানান্তরের অপরাধে (মানি লন্ডারিং) অন্তত ৩৭ জন সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে বিশেষ অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। তদন্তকারীরা এখন সুনির্দিষ্টভাবে খতিয়ে দেখছেন—এই চক্রের কোটি কোটি টাকা শেষ পর্যন্ত কোথায় গেছে, কার কার নামে সম্পদ কেনা হয়েছে, ব্যাংক হিসাবগুলোতে কী ধরনের অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে এবং কোনো টাকা সীমান্ত পার করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে কি না।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের ধারণা, মূল প্রশ্নফাঁস মামলার চেয়েও এই আর্থিক কেলেঙ্কারি ও মানি লন্ডারিংয়ের অনুসন্ধান থেকে আরও অনেক বড়, চাঞ্চল্যকর এবং বিস্ময়কর থলের বিড়াল সামনে চলে আসতে পারে।