
রাজশাহীর পুঠিয়ায় একটি বিদ্যালয়ের মাঠে কলাগাছ লাগানোর পাশাপাশি শিক্ষকদের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক দাতা সদস্য আজাদ আলী। বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকও বাঁশের বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
পুত্রবধূকে চাকরি না দেওয়া এবং প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের বিরোধিতা থেকেই তিনি এমনটি করেছেন বলে জানিয়েছেন। তবে প্রধান শিক্ষক দাবি করেছেন, আজাদ আলীর পুত্রবধূকে চাকরি দেওয়া হয়েছিল।
ছুটির দিনে মাঠে কলাগাছ, ফটকে বাঁশের বেড়া
বিদ্যালয়টির বর্তমান নাম ভালুকগাছি মুক্তিযোদ্ধা স্কুল। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠার সময় এর নাম ছিল মুক্তিযোদ্ধা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সাপ্তাহিক ছুটির দিনে লোকজন সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয়টিতে যান সাবেক দাতা সদস্য আজাদ আলী। সেখানে মাঠে কলাগাছ লাগানোর পাশাপাশি শিক্ষকদের কার্যালয়ে আগে থেকে থাকা তালার ওপর নতুন করে আরেকটি তালা লাগিয়ে দেন। একই সঙ্গে বাঁশ দিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান প্রবেশপথ ঘিরে দেওয়া হয়।
স্থানীয় দোকানি লাল মোহাম্মদ বলেন, একসময় বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। পরে মামলা হওয়ার কারণে শিক্ষার্থী কমেছে। এরপরও নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে। তার অভিযোগ, হঠাৎ আজাদ আলী এসে প্রধান ফটক এমনভাবে বন্ধ করে দিয়েছেন যে বিদ্যালয়ের নলকূপের পানিও ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
নাম পরিবর্তন নিয়ে বিরোধের শুরু
প্রতিষ্ঠার সময় বিদ্যালয়টিতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পাঠদানের পরিকল্পনা ছিল। তবে তখন উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমোদন না থাকায় কার্যত প্রাথমিক পর্যায়েই শিক্ষা কার্যক্রম সীমিত ছিল।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তনের জন্য চিঠি দেওয়া হয়। এরপর বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা সভা করে ‘ভালুকগাছি মুক্তিযোদ্ধা স্কুল’ নাম নির্ধারণ করেন। কমিটির সভার রেজুলেশনে উল্লেখ রয়েছে, তৎকালীন দাতা সদস্য আজাদ আলী নিজেই নামটি প্রস্তাব করেছিলেন।
২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি পায়। তবে এখনো এটি এমপিওভুক্ত হয়নি। বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ের পাশাপাশি ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতেও পাঠদান চলছে। শিক্ষার্থীরা পর্যায়ক্রমে ওপরের শ্রেণিতে উঠলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের অনুমোদন নেওয়ার কথা রয়েছে।
পুত্রবধূর চাকরি নিয়ে দুই পক্ষের ভিন্ন বক্তব্য
আজাদ আলীর দাবি, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় টেকনিক্যাল কলেজ চালু করে তার ছেলে ও ছেলের বউকে চাকরি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টেকনিক্যাল কলেজ হয়নি এবং তার পুত্রবধূকেও চাকরি দেওয়া হয়নি। এ কারণেই তিনি বিদ্যালয়ে তালা দেওয়া ও মাঠে কলাগাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান।
তবে প্রধান শিক্ষক সেলিম রেজার বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, আজাদ আলী কোনো শর্ত ছাড়াই বিদ্যালয়ের জন্য জমি দিয়েছিলেন এবং ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা দিয়ে প্রতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেন। পরে ভবন নির্মাণের পর জমি প্রতিষ্ঠানের নামে রেজিস্ট্রি করার সময় তিনি ভোকেশনাল শাখায় ছেলের এবং কলেজ শাখায় পুত্রবধূর চাকরির দাবি করেন। কমিটি তার দাবিতে সম্মতি দিয়েই জমি রেজিস্ট্রি করে নেয় বলে জানান প্রধান শিক্ষক।
সেলিম রেজার ভাষ্য, কলেজ শাখা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হতে সময় লাগায় আজাদ আলীর পুত্রবধূকে প্রাথমিক শাখায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। চাকরিরত অবস্থায় ২০২২ সালে তিনি মারা যান। পরে আজাদ আলী ছেলের দ্বিতীয় বিয়ের পর নতুন পুত্রবধূকেও মাধ্যমিক শাখায় কেরানি পদে নিয়োগ দেওয়ার দাবি করেন। কমিটি তাতেও সম্মতি দেয় এবং এ বিষয়ে রেজুলেশন রয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, এর প্রায় এক বছর পর ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আজাদ আলী রাজশাহীর আদালতে মামলা করেন। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, যে নামে প্রতিষ্ঠান করার জন্য তিনি জমি দিয়েছিলেন, সেই নামে প্রতিষ্ঠান করা হয়নি। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও ভালুকগাছি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে সময় লাগে। আজাদ আলীর দাবি সঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে এবং নিয়মিত পাঠদান চলছে। গত মাসের ১০ তারিখে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড নতুন ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন দিয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিয়াকত সালমান বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। বর্তমানে ঢাকায় থাকায় ফিরেই প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম চালুর ব্যবস্থা করবেন। তিনি বলেন, পেছনে যে ঘটনাই থাকুক না কেন, শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়।