
বন্যা পরিস্থিতি ও চরম প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও চট্টগ্রাম ছাড়া দেশের সব শিক্ষা বোর্ডে চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সচল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কতৃপক্ষ।
তবে একদিকে যখন পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা এসেছে, অন্যদিকে তখন দুর্যোগের মাঝে পরীক্ষা আয়োজন এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘বিতর্কিত মন্তব্যের’ জেরে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে পরীক্ষার্থীরা। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে আজ রাজধানীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, স্থগিত শুধু চট্টগ্রামে
আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ১০টায় দেশের সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নিয়ে আয়োজিত একটি ভার্চুয়াল সভায় পরীক্ষা সচল রাখার এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রীও।
সভা শেষে দুপুর দেড়টার দিকে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানান, দেশের সার্বিক বন্যা ও আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনা করে আপাতত কেবল চট্টগ্রাম বোর্ড বাদে বাকি সব বোর্ডের পরীক্ষা চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে চট্টগ্রামের অধীনস্থ পাঁচটি জেলার পরীক্ষা আপাতত স্থগিত থাকবে।
‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্যে ক্ষোভ, রাজপথে শিক্ষার্থীরা
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং এর ওপর পরীক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে সম্বোধন করার অভিযোগে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে। এর প্রতিবাদে সকাল থেকেই রাজধানীর সায়েন্সল্যাব, উত্তরা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন বিভিন্ন কলেজের পরীক্ষার্থীরা। তারা শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের তাৎক্ষণিক পদত্যাগ দাবি করেন।
সায়েন্সল্যাব মোড় অবরোধ: সকাল ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে ঢাকা কলেজসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সায়েন্সল্যাব মোড়ে জড়ো হয়ে ধানমন্ডিমুখী সড়কটি আটকে দেন। এতে ওই রুটে পুরোপুরি যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বাধ্য হয়ে অনেক যাত্রীকে হেঁটে গন্তব্যে রওনা হতে দেখা যায়।
উত্তরায় স্থবিরতা: উত্তরা পশ্চিম থানার ডিউটি অফিসার শাহীন আলম জানান, সকাল পৌনে ১২টার দিকে বিএএনএস (বিএনএস) সেন্টারের সামনে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিলে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত সড়কে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়।
পুলিশের অবস্থান: নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব জানান, সায়েন্সল্যাব এলাকায় শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে অবস্থান নিলে পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত করতে তাদের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা চালায়। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সায়েন্সল্যাবসহ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও সতর্কাবস্থায় রাখা হয়।
স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত রাজপথ
বিক্ষোভের সময় শিক্ষার্থীদের মুখে ‘দফা এক, দাবি এক—মিলনের পদত্যাগ’, ‘ভোগান্তির দায় নিতে হবে’ এবং ‘বন্যা-জলাবদ্ধতায় পরীক্ষা নয়’—এমন সব স্লোগান শোনা যায়। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডগুলোতেও পরীক্ষা স্থগিত ও মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি স্পষ্টাক্ষরে লেখা ছিল।
বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বন্যা ও চারদিকের জলাবদ্ধতার বাস্তব চিত্রকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে গত সোমবারের এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। যার ফলে রাজধানীসহ দেশজুড়ে পরীক্ষার্থীদের অবর্ণনীয় কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কোথাও কোমর পানি, কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যাম, আবার কোথাও নৌকা বা বিকল্প উপায়ে কেন্দ্রে যেতে হয়েছে। অনেকেই পরীক্ষা শুরুর বহু আগে ঘর থেকে বেরিয়েও ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারেননি।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী কাশেম শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
"বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত না করেই পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেই তারা কর্মসূচি পালন করছেন।"
একই সুরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিটি কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন,
"সোমবারের ভোগান্তির দায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না।"
তিনি শিক্ষার্থীদের এই চরম দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনা করে দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার জোর দাবি জানান।