
গত বছরের ৫ আগস্ট গণভবন ছাড়ার পর দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে শেষমেশ দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মুখ খুলেছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের নামী গণমাধ্যম ‘এই সময়’ পত্রিকাকে দেওয়া এক একান্ত ও দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেছেন। শেখ হাসিনা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমতার প্রতি তাঁর কোনো মোহ বা লোভ নেই, তবে দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি যে দায়বদ্ধতা রয়েছে, তা তিনি কোনো অবস্থাতেই ভুলে যেতে পারেন না।
সাক্ষাৎকারে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণভবন ছেড়ে যাওয়ার সেই নাটকীয় মুহূর্তটিকে অত্যন্ত আকস্মিক ও ভীতিকর হিসেবে আখ্যা দেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি টুঙ্গিপাড়ায় চলে যাব বলে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। প্রকৃতপক্ষে আমি জানতামই না যে আমি দেশের বাইরে যাচ্ছি।’ তিনি আরও দাবি করেন, ওই দিন আচমকা নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে ধাবিত হওয়ায় এবং উগ্র জনতা গণভবন আক্রমণের মুখে থাকায় একটি আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র তৈরি করার মতো ন্যূনতম সময়টুকুও তিনি পাননি।
তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবনের মূল লক্ষ্য ক্ষমতা বা পদ-পদবি ছিল না, বরং জনগণের ভাগ্য উন্নয়নই ছিল মুখ্য—এমন দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, "আমি দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য, তাদের উন্নত জীবন নিশ্চিত করার জন্য দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। তাদের জীবনের বিনিময়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার চিন্তা আমি কখনওই করিনি।" একই সঙ্গে দেশের এই চলমান বৈরী ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি সবসময় মানুষের পাশে থাকার মানসিকতা লালন করেন বলে জানান।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনকে কোনোভাবেই ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ বা সাধারণ গণঅভ্যুত্থান হিসেবে মানতে রাজি নন শেখ হাসিনা। তাঁর দাবি, এটি আসলে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে তাঁর সরকারকে উৎখাত করার একটি সুগভীর ও পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক ব্লুপ্রিন্ট বা ষড়যন্ত্র ছিল, যার পেছনে দেশি ও বিদেশি নানামুখী কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। আন্দোলনের সমন্বয়ক ও বিভিন্ন পক্ষের পূর্বাপর মন্তব্য টেনে তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ সদস্যদের পিটিয়ে হত্যা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ মেট্রোরেলে পরিকল্পিত ভাঙচুর এবং দেশজুড়ে চরম অরাজকতা সৃষ্টি করা মূলত এই নেপথ্য ষড়যন্ত্রেরই অংশ ছিল।
এদিকে, দেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) কর্তৃক তাঁর বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের রায়কে সম্পূর্ণ ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধ’ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। এর পাশাপাশি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের (OHCHR) দেওয়া ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং তদন্ত প্রতিবেদন নিয়েও কড়া প্রশ্ন তোলেন তিনি। এ প্রসঙ্গে হাসিনা বলেন, যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছে, তাদের আমন্ত্রণে পরিচালিত তদন্ত কখনোই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে পারে না।
দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারের একদম শেষ পর্যায়ে এসে নিজের স্থায়ী রাজনৈতিক অবসরে যাওয়ার গুঞ্জন বা সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেন শেখ হাসিনা। তিনি আবারও পুনর্ব্যক্ত করেন যে, দেশের মানুষের এই কঠিন ও দুঃসময়ে তিনি নিজেকে রাজনীতি থেকে গুটিয়ে নেবেন না। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, সত্যের পথ সবসময় কণ্টকাকীর্ণ ও কঠিন হলেও দিনশেষে সত্যেরই জয় নিশ্চিত এবং বাংলাদেশের মানুষের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ সাধনই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একমাত্র ব্রত।