
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে সড়ক, বাজার, পাড়া-মহল্লার অলিগলি, স্কুল-মাদরাসা ও জনবহুল এলাকার আশপাশে বেড়েছে বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত। দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়ানো এসব কুকুরের মধ্যে কয়েকটির আচরণ আক্রমণাত্মক হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্কও বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের দেখলেই তেড়ে আসা কিংবা পথচারীদের পিছু নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আড়াইহাজার পৌরসভার বিভিন্ন মহল্লার পাশাপাশি গোপালদী পৌরসভা, ব্রাহ্মন্দী, দুপ্তারা, ফতেহপুর, সাতগ্রাম, মাহমুদপুর, বিশনন্দী, হাইজাদী, খাগকান্দা ও কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকাতেও বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত বেড়েছে। বাজার, স্কুল, মাদরাসা, হাসপাতাল ও জনবহুল স্থানের আশপাশে একসঙ্গে ৮ থেকে ১০টি কুকুর ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য এখন অনেকটাই স্বাভাবিক।
সকালে শিশুরা স্কুলে যায়, দুপুরে শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফেরে। বিকেলে নারী, শিশু ও বয়স্করা প্রয়োজনীয় কাজে রাস্তায় বের হন। কিন্তু এসব স্বাভাবিক চলাচলের পথেই কুকুরের উৎপাত নিয়ে আতঙ্ক বাড়ছে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের একা স্কুলে পাঠাতে চাইছেন না। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, কোথাও কোথাও শিশুরা দলবেঁধে চলাফেরা করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বেওয়ারিশ কুকুরের মধ্যে কয়েকটি মাঝেমধ্যে পথচারী ও শিশুদের তাড়া করে। কুকুরের হাত থেকে বাঁচতে দৌড়াতে গিয়ে কেউ পড়ে আহত হন, আবার কেউ সরাসরি কামড়ের শিকার হন।
আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, কুকুরের কামড়ে আহত হয়ে প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ জন চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি।
এই হিসাবে মাসে গড়ে ২১০ থেকে ২৪০ জন কুকুরের কামড়ের শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেন। তবে স্থানীয় ক্লিনিক বা অন্যত্র চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের সংখ্যা এই হিসাবের বাইরে রয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজনের স্বজন জানান, কুকুরের কামড়ের পর শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ক্ষত ছোট হলেও জলাতঙ্কের আশঙ্কায় দ্রুত হাসপাতালে যেতে হয়। টিকা ও চিকিৎসার জন্য পরিবারের ওপর বাড়তি খরচও পড়ে।
রামচন্দ্রদী এলাকার অভিভাবক আবুল কালাম বলেন, ‘আমার সন্তানকে একা স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে কুকুরের দল থাকে। শিশুদের দেখলেই কয়েকটি কুকুর তেড়ে আসে।’
দুপ্তারা এলাকার অভিভাবক রাবেয়া বেগম বলেন, ‘স্কুলে যাওয়ার সময় বাচ্চাদের সঙ্গে কেউ না থাকলে চিন্তা হয়। কয়েকটি কুকুর একসঙ্গে থাকলে শিশুরা ভয় পেয়ে দৌড় দেয়। তখন দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে।’
ফতেহপুর এলাকার শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে কুকুরের দল থাকলে ছোট শিশুরা ভয় পায়। অনেক অভিভাবকও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন।’
গোপালদী পৌরসভার বাসিন্দা মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সন্ধ্যার পর রাস্তায় বের হলে দলবদ্ধ কুকুর দেখা যায়। মোটরসাইকেল দেখেও অনেক সময় কুকুর তাড়া করে।’
ব্রাহ্মন্দী এলাকার রিমা আক্তার বলেন, ‘বাসার সামনে কয়েকটি কুকুর বসে থাকে। একা বের হতে ভয় লাগে। বাচ্চাদের নিয়েও চিন্তা হয়।’
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলাতঙ্ক প্রতিরোধে টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমানে ভ্যাকসিনের সংকট রয়েছে।
আড়াইহাজার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আতাউর রহমান বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকায় বেওয়ারিশ কুকুর নিধন করা যাচ্ছে না। তবে কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়ার কার্যক্রম রয়েছে। কয়েক মাস ধরে ভ্যাকসিনের সংকট থাকায় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয়। আমরা ভ্যাকসিন দিয়ে থাকি। কিন্তু কয়েক মাস ধরে ভ্যাকসিনের সংকট রয়েছে। সরবরাহ পাওয়া গেলে টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।’
আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার ও পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, কুকুরের কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে শিশুরা আক্রান্ত হলে কোনো ধরনের অবহেলা না করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে।
সচেতন মহলের মতে, শুধু কুকুর তাড়িয়ে দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নিয়মিত টিকাদান, বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, যেখানে-সেখানে খাবারের উচ্ছিষ্ট ও বর্জ্য পড়ে থাকলে সেখানে কুকুরের আনাগোনা বাড়ে। বাজার ও আবাসিক এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা গেলে কুকুরের দলবদ্ধ অবস্থানও কিছুটা কমানো সম্ভব।
আড়াইহাজারের মানুষের প্রশ্ন এখন শুধু বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা কত, তা নয়। প্রতিদিন যে ৭ থেকে ৮ জন মানুষ কুকুরের কামড়ে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন, তাদের মধ্যে কতজন শিশু—এবং এই আতঙ্ক থেকে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ রাখতে কার্যকর উদ্যোগ কবে নেওয়া হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।