
মার্কিন গাড়ি, অ্যালকোহল ও দুগ্ধজাত পণ্যে বৈষম্যমূলক নীতির অভিযোগ এনে কানাডা থেকে আমদানি হওয়া প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ নতুন শুল্ক চাপানোর ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী ১৯ আগস্ট থেকে এই নজিরবিহীন অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হতে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে যে ট্রাম্প প্রশাসন ১৯৩০ সালের ঐতিহাসিক ট্যারিফ অ্যাক্টের 'সেকশন ৩৩৮' প্রয়োগ করে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। প্রায় এক শতাব্দী আগে প্রণীত এই বিশেষ আইন ব্যবহার করে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের শুল্ক আরোপের ঘটনা ইতিহাসে এটাই প্রথম।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ওয়াশিংটনের এই নতুন শুল্ক নীতির আওতায় কানাডার ওয়াইন, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, আসবাবপত্র, পোশাক, উইগ, সাঁতারের পুল, হকি স্টিক, মাছ ধরার সরঞ্জাম ও বীজসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য অন্তর্ভুক্ত থাকছে। ২০২৫ সালে কানাডা থেকে মোট ৩৮২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, যা হিসাব করলে নতুন শুল্কটি তাদের সার্বিক আমদানির প্রায় ৫.২ শতাংশ পণ্যের ওপর বলবৎ হচ্ছে।
নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেন:
অন্যান্য অংশীদার দেশের তুলনায় কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প সুরক্ষা ও বাণিজ্য ভারসাম্য আনার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছে। তাই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন এই সিদ্ধান্তের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি উল্লেখ করেছেন, ওয়াশিংটনের সাথে বিদ্যমান সীমান্ত বাণিজ্য বিরোধ মেটাতে তাঁর সরকার আগেই বিস্তারিত প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ইতিপূর্বে আরোপিত শুল্কসমূহ উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (ইউএসএমসিএ) স্পষ্ট লঙ্ঘন।
বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী কার্নি ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান:
‘এই বাণিজ্য বিরোধের কারণে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর ব্যয় বেড়েছে। বাকি থাকা সমস্যাগুলোর সমাধানে পারস্পরিক স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে কানাডা প্রস্তুত।’
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, মূলত কোনো দেশ মার্কিন পণ্যের ওপর বৈষম্যমূলক কর বা শুল্ক আরোপ করলে তার জবাবে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক বসানোর উদ্দেশ্যে ১৯৩০ সালে ‘সেকশন ৩৩৮’ ধারাটি পাস করা হয়েছিল। তবে পাস হওয়ার পর আজ পর্যন্ত কোনো মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান এটি বাস্তবে প্রয়োগ করেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জ্যেষ্ঠ বাণিজ্য কর্মকর্তা জন ভেরোনো এ প্রসঙ্গে জানান, ইতিপূর্বে একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই ধারার আশ্রয় নেওয়ার কথা ভাবলেও বাস্তবে প্রয়োগ থেকে বিরত থাকেন। তাঁর মতে, প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার পাল্টা জবাবে এই আইনের ব্যবহার আইনের মূল চেতনার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে ইউএসএমসিএ চুক্তির আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া বেশ কিছু পণ্যের ওপরও এই নতুন নিয়ম প্রযোজ্য হবে। অবশ্য জ্বালানি, পটাশ, সামুদ্রিক মাছ, অতি প্রয়োজনীয় খনিজ এবং সেকশন ২৩২-এর অধীনে আগে থেকেই থাকা নির্দিষ্ট কিছু পণ্যকে এই অতিরিক্ত শুল্কের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
হুট করে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পেছনে অটোয়া প্রশাসনের বেশ কিছু নীতিকে দায়ী করেছে হোয়াইট হাউস। এর মধ্যে কানাডার ডেইরি খাতের বিশেষ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, মার্কিন তৈরি গাড়িতে উচ্চ শুল্ক ও কোটা নির্ধারণ এবং দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে আমেরিকান অ্যালকোহল বিপণন বন্ধ রাখাকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, নীতিগত জটিলতার কারণে গত এক বছরে কানাডায় মার্কিন গাড়ি আমদানি ২২ শতাংশ এবং আমেরিকান অ্যালকোহল সরবরাহ প্রায় ৮১ শতাংশ ধসে পড়েছে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই অভিযোগের জবাবে কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর উপদেষ্টা ডায়মন্ড ইসিঙ্গার জানান, দেশটির প্রাদেশিক বাজারগুলোতে মার্কিন মদ বা অ্যালকোহল পুনরায় বিক্রি শুরু করার বিষয়ে অটোয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের হাত বাঁধা; কারণ এ জাতীয় সিদ্ধান্ত সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক সরকারের এখতিয়ারভুক্ত।